সংবাদ ডেস্ক :

উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর আওতায় পরিদর্শন বাংলো নির্মাণ পরিহারের অনুশাসন দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেটা গত বছরের কথা। সম্প্রতি করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারির কারণে নতুন করে ব্যয় সাশ্রয়ের পথে হাঁটছে সরকার। তাতে করে মূল প্রকল্পের বাইরে ‘কম প্রয়োজনীয়’ অনুষঙ্গগুলোকেও প্রকল্পে যোগ করতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। তবে এই সময়েও একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পে এসব অনুশাসন বা নির্দেশনা মানতে দেখা যাচ্ছে না। এর আগে সেতু নির্মাণের এক প্রকল্পে প্রায় চার কোটি টাকা খরচ করে বাংলো নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এবারে একই প্রস্তাব করা হয়েছে সড়ক প্রশস্ত করার এক প্রকল্পে। তবে এই বাংলোর খরচ একটু ‘কম’— প্রায় সোয়া ২ কোটি টাকা।

‘বারৈয়ারহাট-হেঁয়াকো-রামগড় সড়ক প্রশস্তকরণ’ শীর্ষক এই প্রকল্পে প্রস্তাব করা হয়েছে বাংলো নির্মাণের। এতে খরচ হবে ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এ বাংলো নির্মাণের প্রস্তাবে আপত্তিও জানায়নি পরিকল্পনা কমিশন। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হচ্ছে প্রকল্পটি। পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, অনুমোদন পেলে চলতি মাসে শুরু হয়ে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর।

সূত্র জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৪৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ হবে ২৬৭ কোটি ১২ লাখ টাকা, ভারতীয় ঋণ থেকে আসবে ৫৮১ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আমদানি-রফতানি ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণসহ এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে বলে আশা করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্পের ব্যয় বিভাজন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ‘বারৈয়ারহাট-হেঁয়াকো-রামগড় সড়ক প্রশস্তকরণ’ প্রকল্পের আওতায় ৮৪০ বর্গমিটারের একটি পরিদর্শন বাংলো নির্মাণের জন্য ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে পরিকল্পনা কমিশন থেকে বলা হয়েছে, প্রকল্পের মাধ্যমে রামগড়ে পরিদর্শন বাংলো নির্মাণের বিষয়টি ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) উল্লেখ করতে হবে। এছাড়া গণপূর্ত অধিদফতরের রেট শিডিউল অনুযায়ী এই বাংলো নির্মাণের ব্যয় প্রাক্কলন, লে আউট প্ল্যান বা ফ্লোর প্ল্যান ডিপিপিতে যুক্ত করতে হবে।

প্রকল্পের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মধ্যে ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে তৃতীয় লাইন অব ক্রেডিটের জন্য একটি এমওইউ (সমঝোতা স্মারক) সই হয়। এতে রামগড় থেকে বারৈয়ারহাট সড়ক প্রশস্ত করতে প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রস্তাবিত সড়কটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৭২ কিলোমিটার ও ঢাকা থেকে ২০১ কিলোমিটারর দূরত্বে অবস্থিত। ফলে এটি প্রশস্ত করা হলে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর ও রামগড় স্থলবন্দরের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে সহায়ক হবে। এ প্রেক্ষাপটেই সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি ৫ দশমিক ৫ মিটার থেকে বাড়িয়ে ৭ দশমিক ৩ মিটার প্রস্থে উন্নীত করণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব পাওয়ার পর প্রথম দফায় গত বছরের ২২ অক্টোবর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে একই বছরের ২৮ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফা পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সুপারিশগুলো প্রতিপালন করায় এখন প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছে।

বাংলো নির্মাণ নিয়ে আপত্তি নেই

সম্প্রতি খুলনায় মহাসড়কে বিদ্যমান সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ পুরাতন কংক্রিট সেতু বা বেইলি সেতুর জায়গায় কংক্রিটের সেতু নির্মাণের একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণ শেষ হয়েছে। ওই প্রকল্পেও একটি প্রকল্পে পরিদর্শন বাংলো নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। ওই সময় পরিকল্পনা কমিশন থেকে বলা হয়, ২০১৯ সালের ২৬ নভেম্বর একনেক সভায় উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কর্মকর্তাদের জন্য বাসভবন বা পরিদর্শন বাংলো ইত্যাদি নির্মাণ পরিহারের অনুশাসন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রীর এই অনুশাসনের আগেই গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর সেতু নির্মাণের প্রকল্পটি নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। ফলে সেসময় প্রকল্পের আওতায় পরিদর্শন বাংলো নির্মাণের বিষয়টি রাখা হয়েছিল। এছাড়া খুলনা জোনের পরিদর্শন বাংলোটি অনেক পুরনো ও জরাজীর্ণ হওয়ায় চূড়ান্ত প্রকল্প প্রস্তাবে সওজ-এর নিজস্ব জমিতে ৫ হাজার বর্গমিটার আয়তনের পরিদর্শন বাংলোর সংস্থান রাখা হয়। তবে সড়ক প্রশস্ত করার এই প্রকল্পে বাংলো রাখার প্রস্তাবের কোনো ব্যাখাও দেওয়া হয়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, সড়ক প্রশস্ত করার প্রকল্পে পরিদর্শন বাংলো নির্মাণ অপরিহার্য নয়। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সরকারের রাজস্ব আদায় এমনিতেই অনেক কমে গেছে। সেখানে একেবারেই অপরিহার্য না হলে এসব অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাদ দেওয়া উচিত ছিল। কোনো খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে এমন ব্যয় কাম্য নয়। করোনার কারণে উন্নয়ন প্রকল্পে গাড়ি কেনা বন্ধ ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর স্থগিতসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশও রয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় সাশ্রয় করতে হবে। পরিকল্পনা কমিশনের উচিত ছিল পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এমন প্রস্তাবে ভেটো দেওয়া।

তবে প্রকল্পটি প্রক্রিয়াকরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) শামীমা নার্গিস সারাবাংলাকে বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নিরাপদ, উন্নত, সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ী সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটবে। এসব দিক বিবেচনায় একনেকে অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে— ভূমি অধিগ্রহণ, সড়ক বাঁধে মাটির কাজ, বিদ্যমান পেভমেন্ট উচুঁ করা, হার্ড শোল্ডার নির্মাণ, সার্ফেসিং, রিজিড পেভমেন্ট তৈরি, পিসি গার্ডার ব্রিজ তৈরি, ২০টি আরসিসি বক্স কার্লভাট নির্মাণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here