দুঃখ প্রকাশ

  আলতাকিদ কিসমতি 

 

 


‘আমি আসবো না; দেখি, আমাকে আনে কিভাবে’ পুরো হল রুম কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলেন নাইম উদ্দিন। একটু বেখেয়ালে যারা ছিলেন তারা হতচকিয়ে গেলেন। পুরো হল রুম ভরা মানুষ কে কার সাথে কথা বলছে কার কথা কার দিকে যাচ্ছে বুঝাই মুশকিল। তার মধ্যে এই চিৎকারে কার কথা নিয়ে বুঝতে পুরো হলরুম ধপ করে নিরব হয়ে গেলো। নাইম উদ্দিন উদ্ভিতবিদ্যা বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক। বেটে খাঁটো মানুষ। পেট শরীরের তুলনায় একটু বেশি রেরিয়ে পড়ায় অনেকটা গোলাআলুর মতো দেখায়। কলেজের ছাত্রনেতা ও স্থানীয় দলীয় নেতৃবৃন্দের সাথে ভালো যোগাযোগ রাখেন। ক্লাস এবং ছাত্রদের তুলনায় তার পরীক্ষা কমিটিসহ বিভিন্ন কমিটিতেই বেশি আগ্রহ। এসবের সাথে মুখের জোর যুক্ত হওয়ায় প্রায় সময়ই তিনি অধ্যক্ষের অনুগ্রহে থাকেন। নিরবতা ভেঙ্গে একজন বললেন তাহলেতো আপনাকে এবসেন্ট দেয়া হবে। দিক এবসেন্ট, আমি ডরাইনা। দেশের সব ডিগ্রি অনার্স কলেজ যেভাবে চলে এখানে সেই ভাবে চলবে। ঠিক একই সময়ে টিরুম থেকে সিরাজীর চিৎকারের স্বরে আওয়াজ আসলো ‘আমাকে এবসেন্ট দেয়া হয়েছে ? আমি ছুটি নিয়ে গিয়েছি তারপরও আমাকে এবসেন্ট দেয়া হয়েছে ? খোদার দুনিয়ায় এ কেমন বিচার।
টি রুম থেকে এতো চিৎকার আসে কেন, এক শিক্ষকের এমন জিজ্ঞাসে সুরুজ মাথা বের করে বলে ‘স্যার সিরাজী চাচা গতকাল আসেননি সেই জন্য উনাকে যে এবসেন্ট দেয়া হয়েছে সেই কথা আপনাদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে জানিয়ে ছিলাম তাই এই চিৎকার। চতুর্থশ্রেণির কর্মচারীদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক সিরাজী ছোটখাটো মানুষ। উচ্চতা সাড়ে ৪ ফুটের বেশি হবে না। বয়সের তুলনায় বেশভুষায় এবং চেহারায় আরো বেশি বয়ষ্ক মনে হয়। কোন কথা প্রথম বার শোনেন না, দুইবার ডাকলে তিনি শোনেন। কাজের সময় খুব ধীরে হাত পা নাড়েন। তার এই অবস্থার কারণে তাকে সবাই সব কাজে ডাকেন না এবং সেই কারণে মাঝে মাঝে তাকে নিয়ে হাস্যরস করেন। তবে এই চেহারা এবং কানে না শোনা এটা তার চালাকি কিনা বুঝা যায় না। কাজের সময় যদিও ধীরে হাত-পা নাড়েন তবে অন্য সময় হাঁটেন দ্রুত। কানে শোনেন না বা দুর্বল দেখা গেলেও কোন সুযোগ সুবিধা থেকে কখনো কারো থেকে কম থাকেন না। সুরুজের কথা শুনে সিরাজী আরো চটে গিয়ে চিৎকার করে বলেন, প্রিন্সিপাল খেতে খেতে এখন আমাদের গরীবের টাকাও খাবেন নাকি। অন্য এক শিক্ষক বলে উঠলেন ‘এতো চিৎকার আসে কেন ‘বাটিয়া খাও’।
হলরুমের শিক্ষকদের দুএকজন একটু ধাতস্থ হয়ে নাইম স্যারকে জিজ্ঞাস করলেন কি হয়েছে ‘জানা গেলো কে একজন নাকি বলেছেন করিম স্যার অধ্যক্ষের দায়িত্ব পেলে না-কি সবাইকে প্রতিদিন আসতে হবে। অন্য একজন উঠে বললেন ঠিক কথাইতো বলেছেন নাইম স্যার। পক্ষের লোক পেয়ে নাইম উদ্দিন আরো জোর গলায় বলেন, কাউকে তেল দিয়ে চলি না। বর্তমান প্রিন্সিপালকেও কখনো টাইম দেই নাই। কথার এই পর্যায়ে করিম স্যার রুমে প্রবেশ করলেন পুরো শিক্ষক মিলনায়তন নিরব। আজ সব শিক্ষক এসেছেন। কোন ক্লাস নেই। গোলাপগঞ্জের নবদ্বীপ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সুখ রঞ্জন দাস অবসর গ্রহণ করছেন। আজ তার শেষ কর্মদিবস। আজকে তিনি সব কিছু কলেজকে বুঝিয়ে দিবেন। কলেজের শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র হিসেবে অর্থনীতি বিভাগের প্রধান আহমেদ করিম এর নিকট দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। সে উপলক্ষে সব শিক্ষক উপস্থিত হয়েছে। করিম স্যারের প্রবেশে কথার মধ্যে ছেদ পড়ে যায়।
প্রিন্সিপালের বিদায় উপলক্ষে শিক্ষকদের আগমন ঘটলেও সবাই শান্ত-স্বাভাবিক এবং কিছুটা উৎফুল্ল মনে হচ্ছে। কেউ বিদায়ের রাগিনীতে কাতর নয়, এ বিদায় যেন দীর্ঘদিনের প্রতিক্ষিত, কাঙ্খিত এবং প্রত্যাশিত। শিক্ষকরা বেশ হাস্যরসে গল্পগুজব করছেন। কে কি করে এসেছেন, কার শাড়ি কেমন, ছেলে মেয়ে কি করছে এসব তাদের আলোচনার মূল আলোচ্য। প্রতিষ্ঠান প্রধানদের এই এক দুঃখ কোন কর্মকর্তা কর্মচারীই তাদের ভালো পায় না। এই অধ্যক্ষের বেলায়ও তার ব্যাত্যয় হলো না।
তবে অধ্যক্ষ সুখ রঞ্জন দাসের ব্যাপারে সবাই একমত তিনি অত্যন্ত শান্তশিষ্ট এবং স্বল্পভাসী। যে কোন কেউ সাক্ষাতে একজন নিরেট ভালো মানুষের সাথে পরিচিত হয়ে তৃপ্ত হবেন। তার অনুচ্চ স্বরে অস্ফুট উচ্চারণে কথা কেউ শুনলে প্রথমে হয়তো পুরোটা বুঝতেও পারবেন না। এতো ধীরে আর শব্দহীন উচ্চারণ যে নিজের কানেই নিজে শুনতে পান কি-না সন্দেহ। ধবধবে সাদা চুল মাথার উপরে পরিপাটি করে বসানো। কোন ঢেউ নেই, জেল দিয়ে যেমন চুল বসানো হয় তেমনি থাক থাক করে বসানো। সামনের দিকে হালকা বেক ব্রাশ দিয়ে ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছে। তাতে কপালের উপর চুল গুলো আরো সুন্দর ভাবে একটি ছাদের মতো সৃষ্টি করেছে। তরুণদেরকে চুলের এই স্টাইল করতে অনেক কসরত করতে দেখা যায়। কালো চেহারার উপর মাথায় সুবিন্যস্ত সাদা চুল এবং পরিপাটি পোশাকে মাঝারি উচ্চতার হালকা-পাতলা শরীরে এক পূত-পবিত্র, সৌম্য-শান্ত আবহের সৃষ্টি করে। চূড়ান্ত কোন সমস্যা ছাড়া তার উচ্চবাচ্য শোনা দুরুহ ব্যাপার। কলেজে প্রিন্সিপাল বলয় এবং বিপক্ষ বলয়ের দুই গ্রুপ থাকলেও অধ্যক্ষ স্যার প্রায় পুরোপুরি ভাবেই সবাইকে নিয়েই চলতে পারেন। প্রিন্সিপাল গ্রুপ কে অপর পক্ষ সুবিধাভোগী মনে করেন এবং সেই মনোবেদনায় বঞ্চিত বলয়ের কেউ যদি তাকে কখনো কটুকথা শোনায় তাতেও কোন উচ্চবাচ্য করেন না। বঞ্চিত গ্রুপ প্রায় সময়ই প্রিন্সিপালের নানা কৃর্তিকর্ম প্রকাশ করে তার দুর্বলতা প্রকাশে সচেষ্ট হোন। কিন্তু কোন ভাবেই তারা তাতে সক্ষম হোন না। বিষয়টি ইউএনও বা উপরের দিকে গেলে অধ্যক্ষকে দেখলেই তদন্তকারীরা বুঝতে পারেন তিনি সরলতার শিকার। তার বোকা বোকা অবুঝ শিশুর মতো চাহনি, কথা বলতে গিয়ে কথা আটকে যাওয়া, নয়নে দারুন করুণা এমন এক জলবায়ু সৃষ্টি করে যা তদন্তকারী বা কমিটির সদস্যদের সবসময় এক কথায় বুঝিয়ে দেয় ভিতরে অন্য সমস্যা আছে।


একবার অধ্যক্ষের ব্যাপারে একটি তদন্তে এসে ইউএনও শিক্ষকদের প্রায় পরিষ্কার বলেই দিলেন আপনারা অধ্যক্ষের সাথে অযথা বিরোধ করছেন আর আমাদের সময় নষ্ট। সেবার কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ইউএনও অধ্যক্ষের এমন এই বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় কমিটির সবাইকে অধ্যক্ষের রুমে রেখে বেরিয়ে আসলেন। সবাই বলে উঠলেন কি দরকার বলেন, এখানে এনে দিবে। না না আমি একটু হেটে আসছি বলে ইউএনও বেরিয়ে আসলেন। তিনি শিক্ষক মিলনায়তনের একটি খালি চেয়ারে দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে বসতে বসতে বললেন এক গ্লাস পানি খাওয়ান। করিম স্যার বেয়ারারকে পানি আনতে বলে, জিজ্ঞাস করলেন ফাইল দেখতে দেখতে হাতে ব্যাথা করছে নিশ্চয়। জি¦ না হাতে নয়, কানে ব্যাথা করছে। অধ্যক্ষ কি বলেন সব কথা বুঝা যায় না। তিনি কথা বলার সময় কান খাড়া করে রাখতে হয়। কান খাড়া রাখতে রাখতে কানের সাথে সাথে হাত-পা অবস হয়ে যাচ্ছে। মানুষটা কথাই বলতে পারেন না ঠিকমতো তাকে শুধু শুধু বিপদে ফেলছেন আর আমাদের সময় নষ্ট করছেন।
এমন সহজ সরল মানুষ এই যুগে পাওয়া যায় না। মানুষ ক্ষমতা পেলে কি রকম দুর্দান্ত, প্রতাপশালী, বেপরায়া হয়ে উঠেন তার তুলনায় এই মানুষটা বলতে হবে ফেরেশতা তুল্য। অধ্যক্ষ হয়েছেন কিন্তু সবকিছু বুঝেন না। প্রতিষ্ঠান চালানোর মতো কোন অভিজ্ঞতাই নেই। তাই কাজ গুলো ঠিকমতো গুছিয়ে করতে পারেন না। তার এই দুর্বলতার বা সরলতা যাই বলুন না কেন তার সুযোগ নিতে চাচ্ছেন কেউ কেউ। খুবই দুঃজনক। শিক্ষক মিলনায়তন নিরব নিশ্বব্ধ। সবাই বুঝতে চাইছিলেন ইউএনও কি সত্যিই বলছেন না, ঘটনার আকষ্কিকতায় তিনি নিজে তার নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়েছেন।
একবার এলাকার বিশিষ্ট সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগী জুনই ডাক্তার একবার নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ছিলেন। স্থানীয় জজগেইট বাজারে তার ডিসপেনসারী। ঔষধ বিক্রি এবং সুই মারা বা সেলাইন দেয়া তার ডাক্তারীর প্রধান কাজ। বিশেষ করে মহিলা ও এলাকার বৃদ্ধদের চিকিৎসার জন্য তাকে বিশেষ সমিহ করা হয়। শহরে বড় ডাক্তার দেখালেও জুনই ডাক্তারকে একবার না দেখালে না, হয়। এলাকায় প্রচলিত আছে জুনই ডাক্তার শরীরের হাত দিলেই নাকি রোগ ভালো হয়ে যায়। শহরের ডাক্তার যাই বলুক না কেন জুনই ডাক্তার না বলা পর্যন্ত মানুষ বুঝতেই পারেন না ঔধষ ও রোগের কি সমাচার। তার ৫০সিসি মোটরসাইলকেল চালিয়ে যখন গ্রামের মধ্যে দিয়ে যান তখন মোটরসাইকেলের শব্দ পুরো গ্রামকেই যেন গ্রাস করে এবং গ্রাসবাসীর মাথা নিজের অজান্তেই ঝুঁকে পড়ে। কোন না কোন ভাবে প্রতিটি মানুষ তার নিকট আসতে হয় বলে তিনি সবসময় সবার উপরে একধরণের কতৃত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। হালকা পাতলা লিকলিকে শরীরের জুনই ডাক্তার। সবসময় পেন্টশার্ট পড়েই থাকেন। সরাচর পাঞ্চাবিও গায়ে চড়ান। তখন হাড়-চামড়ার শরীরে পাঞ্চাবি হেঙ্গারে ঝুলোনের মতো ঝুলতে থাকে। কোঠরাগত চোখ আর গালের উপর বেরিয়ে আসা চোয়ালের হাড় ছাড়া মুখের উপর আর কোন কিছু চোখে পড়ার মতো নেই। গালের হাড়ের উপর আটকে থাকা চশমার উপর দিয়ে যখন তাকান তখন অনেকেই তার সামনে কথা হারিয়ে ফেলেন। এলাকার তার অতি উচ্চ গুরুত্ব থাকায় স্থানীয় প্রতিটি স্কুল কলেজের পরিচালনা কমিটির সাথে তিনি জড়িত। এলাকায় তার একছত্র আধিপত্য এবং সেই সাথে মুখের যথেচ্ছ ব্যবহারে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে তিনি সাক্ষাত যমের প্রতিভ‚ত। তার মুখনির্সিত বানী শ্রবনইন্দ্রের সহ্য ক্ষমতা অতিক্রম করে গেলেও কেউ কিছুই বলার সাহস করেন না এবং তিনি জিহ্বার এই বিশেষ ক্ষমতা অহরহ ব্যবহার করেন।
নবদ্বীপ ডিগ্রি কলেজে তিনি দীর্ঘদিন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। একবার এমপির বিশেষ বরাদ্দ থেকে কলেজের জন্য ১৬ মেট্রিকটন চাল দেয়া হয় উন্নয়ন কাজের জন্য। এলাকার নব্য যুবকদের রাজনীতি সচেতনতা ও অতি উৎসাহে এবং কলেজ কমিটির টন-মেট্রেক টন এর হিসেব মিলানের আগেই প্রজেক্ট বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যান কাকে করা হবে তাই নিয়ে সভা আহবান করে বসল। অধ্যক্ষ অবশ্য দু একবার গলা খাখরিয়ে তার সভাবসুলভ অনুচ্চ সুরে সভা মুলতবি করে অন্যদিন সভা করার জন্য প্রস্তব দিয়েছেন। কমিটির সদস্য বদি আলম অধ্যক্ষ সুখ বাবুকে সমর্থন করে ঝুনু ডাক্তার যেহেতু অনুপস্থিত তাই পরে সভা আহবানের প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু দস্যি যুবকরা মিউমিউ কথা খুব একটা পাত্তা না দিয়েই কমিটি করতে নাম প্রস্তাব করতে শুরু করেন। সভায় সর্বসম্মতি ক্রমে আহমেদ করিম স্যারের নামই শেষ পর্যন্ত গৃহীত হয়। এই খবর জুনই ডাক্তারের নিকট যেতে খুব একটা সময় লাগেনি। মুহূর্ত বলা যাবে মোবাইলে পুরো সময়ই তিনি ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে এক রোগীকে ইনজেকশন দেয়ার পর রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ায় তিনি সেদিকে ব্যস্ত রয়েছেন এবং কিছুটা উদ্বিগ্ন। এলাকার উঠতি নেতা মান্নানের স্ত্রীর কিছু হলে তার পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে যাবে। যদিও ঘটনার পরে দুশ্চিন্তায় শহরের ডাক্তারের সাথে কথা বলে আবারো ঔষধ দিয়েছেন। ভুল চিকিৎসা যে পড়ে ছিল যদি শহরে গিয়ে সে বুঝতে পারে বা বিষয়টি কোন ভাবে সাংবাদিকদের হাতে গেলে কেলেংকারির ভয়ে ছিলেন তিনি। এজন্য ডিসপেনসারী থেকে খুব একটা বের হচ্ছিলেন না বলে জানায় দোকানের কর্মচারী বেলাল। জজগেইট বাজার সব শিক্ষকের শারীরিক ও মানসিক রিফ্রেশমেন্ট স্থান। প্রায় সব শিক্ষকই ক্লাস শেষে একবার বাজারে বসে চা খেয়ে যাবেনই। কলেজে ক্লাস ও পরীক্ষা বাদে সব পরিকল্পনা ও কৌশল নিয়ে আলোচনাই হয় বাজারের মানিক রেস্টুরেন্টে। একে অপরের সুনাম বা বদনাম বলুন আর কুস্যা বা সমালোচনা সবই হয় এই মানিক রেস্টুরেন্টে। এটা ডিসপেনসারীতে ডাক্তারের সাথে লিয়াজো করারও একটি উপলক্ষ। ডিসপেনসারীতে অনেকে গিয়ে অসহায়ের সহায়, গরীবের আশ্রয় স্থল, বিনীতের প্রার্থনার ভরসা হিসেবে ডাক্তার সাহেবের আকুন্ঠ প্রশংসা করে তার বিরুদ্ধচারীদের মুন্ডুপাত করে আসেন। সভার দুইদিন পরে সন্ধ্যায় বাজারে মানিক মিয়ার হোটেলে চা খাওয়ার সময় বেলাল ঢুকলো। কি বেলাল কেমন আছ, আমাদের ডাক্তার সাহেব ভালো আছেন তো। বেলাল জানায় ডাক্তার সাহেব এখন খুব ফুরফুরে মেজাজে আছেন। গতকাল লিডার মান্নান ডিসপেনসারীতে এসে জানিয়ে গেছেন তার স্ত্রী এখন ভালো আছেন। পরের দিনই পরিচালনা কমিটির সদস্য বদি আলমকে নিয়ে ডাক্তার সাহেব কলেজে হাজির। আধা মাইল দূর থেকে তার ঐতিহাসিক মোটরসাইকেলের আওয়াজ শুনেই সবাই জেনে গেছেন ডাক্তার আসছেন। শিক্ষক মিলনায়তনে যারা ছিলেন তারা যার যার মতো বেরিয়ে গেলেন। অধ্যক্ষের কক্ষে করিম স্যার, ফরহাদ স্যারসহ আরো কয়েকজন কী এক বিষয়ে কথা বলছিলেন। সেই সময়ই অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করলেন জুনই ডাক্তার। শক্ত চোয়াল, চোখ স্থির, পাঞ্চাবির হাত গুরিয়ে টেবিলের উপর রেখে অধ্যক্ষকে কোন সম্বোধন-সম্ভাষণের সুযোগ না দিয়ে ধমকিয়ে উঠলেন ‘ তোর বাপের টাকা নাকি প্রজেক্ট চেয়ারম্যান করছো করিম না ফরিম কেনো মাস্টারকে। এমপি দিয়েছেন আমরা দেখবো। অন্যদের এতো তাড়াহুড়ো আগ্রহ কেন। বারবার এভাবে ধমকালেও অধ্যক্ষ কোন প্রতিবাদ বা টু শব্দটিও করছেন না। অধ্যক্ষের চোখেমুখেও কোন বিকার নেই। তিনি স্বাভাবিকই আছেন। তৃতীয় বার যখন ডাক্তার বললেন ‘তোর বাপের টাকা নাকি প্রজেক্ট চেয়ার– পুরোটা শেষ করার আগেই করিম স্যার সটান দাড়িয়ে বিকট গর্জনে আঙ্গুন তুলে ‘বের হ, বেরিয়ে যা কলেজ থেকে’ বলে সরাসরি জুনই ডাক্তার কে পাল্টা ধমক দিয়ে বসলেন। হঠাৎ করে যেন সময় থমকে গেছে। পিনপতন নিরবতা, কয়েক মূহূর্ত না অনন্তকাল তা বলা যাচ্ছে না। সবাই জুনই ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে। গ্রামের মানুষ যদি দলবেঁধে কলেজে চলে আসেন তাহলে কি অবস্থা হবে সে কথা কল্পনা করে দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম শিক্ষকদের। যিনি ক্লাসে বোর্ডে লিখছিলেন তার হাত বন্ধ হয়ে গেলো, শিক্ষক মিলনায়তনের পিছনে যিনি সিগারেটটা শুধু ধরিয়েছেন আর টান দেয়ার কথা ভুলে গেলেন, বেয়ারার চায়ের কাপে চামচ চালানী বন্ধ করে দিয়েছে। বাইরে থেকে দোকানের ব্যবসায়ীরাও উৎকর্ণ হয়ে ভিতরে কি হয়েছে বুঝার চেষ্টা করছেন।


কি জানি কি হলো ডাক্তার শুধু একবার তার পরিচয় জানতে চাইলেন, আপনি কে ? প্রশ্ন শেষ হয়েছে কি-না, নিজের পরিচয় দিয়ে করিম স্যার আবারো চোখমুখ বিকৃত করে প্রচন্ড রাগের সাথে বললেন ‘বের হ কলেজ থেকে, যেদিন কথা শিখবি সেদিন আসবি’ এবার জুনই ডাক্তার নিজের উপর থেকে বিশ্বাস হারালেন। মাথা নিচের দিকে দিয়ে কিছুক্ষণ বসে চিন্তা করলেন তিনি কোথায় আছেন, স্বপ্নে কি না, এমন কিছু হয়তো। তার বিশাল বিপুল প্রভাব প্রতিপত্তি, অতুলনীয় সম্মান এই অবস্থায় কেউ তাকে ধমক দিতে পারে তা বিশ্বাস করার মতো নয়ই। শুধুকি তাই; এলাকার প্রতিটি মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস কিছু বলার মতো লোক এখনে নেই। দুই মিনিট নিরব নিঃশব্দ থাকার পর ধীরে ধীরে তিনি উঠে বেরিয়ে গেলেন। অধ্যক্ষ সুখ বাবু আতংকিত মুখে একবার অবশ্য কি যেনো বলতে সবারদিকে মুখ চাওয়া চাওয়ি করে শেষে বলতে পারলেন না। পরে একদিন ঠিকাদার যখন করিম স্যার কে একটি মোটরসাইকেল দিতে চাইলো তখন বিষয়টি অনেকে আসস্থ করতে পেরেছিলেন। তবে জুনই ডাক্তার আর কলেজমুখী হননি।
জুনই ডাক্তারের মতো ইউএনও সেই ভাবে কোন বিশ্বাস ভঙ্গ হয়েছে বলে মনে হলো না। তিনি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবারো অধ্যক্ষের কক্ষে গেলেন এবং সময় নষ্ট না করে অতিসংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে মিটিং শেষ করে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
অধ্যক্ষের রাগ না করার কারনে কেউ বুঝতে পারেন না তিনি কোন দিকে কাজ করছেন। তিনি কার উপর রুষ্ট বা খুশি। এধরণের মানুষগুলো খুবই অনিশ্চিত প্রকৃতির হয়ে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তাদের কেউ বুঝে উঠতে পারেন না। তাদের খুশি করতে গিয়েও কেউ বুঝতে পারবেন না তিনি খুশি হয়েছেন কিনা। সবকিছু নিজের আওতায় রেখে কাজ করেন। কোন কাজ পুরোপুরি কারো হাতে দেন না। সবাইকে একটি ধোয়াশার মধ্যে রাখেন। সবচেয়ে আপন যিনি কোন কোন সময় তারও মনে হবে তিনি কি তার সুনজরে আছেন কি-না। অধ্যক্ষ সবচেয়ে প্রতিপক্ষ যিনি তার নিকট হঠাৎ করে কলেজের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে পরামর্শ চেয়ে বসবেন। তার মোলায়েম কন্ঠে জানতে চাওয়ায় তিনি মনে করবেন এই সরল, আন্তরিক মানুষটাকে একটি অসাধারণ পরামর্শ না দেয়াটা অন্যায় হবে। অধ্যক্ষের এধরনের কাজে নিজ বলয়ের শিক্ষকরাও একটি দোটানায় পড়েন। অধ্যক্ষ বিপক্ষ শক্তিকে জিজ্ঞাস করছেন ? তার মানে অধ্যক্ষ সেই দিকে ঝুঁকে যাচ্ছেন ? তখন পক্ষের-এরা দুই দিক দিয়ে চিন্তায় পড়েন। তারা নতুন বুদ্ধি নিয়ে হাজির হন এবং অধ্যক্ষ অপর পক্ষে যাতে না ভিড়ে যান সেজন্য তাকে আরো বেশি খুশি করতে গেলে পড়েন। এসব নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে ভিষন ঝগড়া বা বাক্যবান নিক্ষেপ হলেও তিনি কোন পক্ষ নেন না। এসব ব্যাপারে তিনি সবসময় ভিষন নিরপেক্ষ থাকেন। দুজনে লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে, শালিনতার সমাধি করেও মরণপন তর্কে থাকেন তারপরও তিনি চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু বলতে পারেন না। আশপাশের শিক্ষকরা যখন সম্মান রক্ষায় দুজনকে জোর করে থামিয়ে যখন অধ্যক্ষ সুখ বাবুকে বলেন স্যার আপন বিছু বলেন।
অধ্যক্ষ ধীরে, ছোট করে একলাস সাহেব কি করা যায় ? বাংলার শিক্ষক একলাস আহমদ একটি প্রস্তাব দিলে তিনি একলাস সাহেব বলছেন, সমাধান এভাবে হোক; কি বলেন। সবাই তখন এসপার কি উসপার শেষ হলেই হলো। বিরোধরতদের কোন একজন হয়তো পরের দিন বললেন এটা কোন বিচার হলো। উনি অন্যায় করলেন আমাকে নূন্যতম শান্তনা না দিয়ে বরং আমাকেই অপরাধী বানিয়ে দেয়া হলো। তখন অধ্যক্ষ তার সহজ সরল চাহনি আর স্বভাবসুলভ ধীরালয়ে বলেন দেখুন আমি সহজ সরল মানুষ। ঝামেলার মধ্যে আমি নেই। আর সিদ্ধান্তটা দিয়েছেন একলাস সাহেব।
একবার অধ্যক্ষের সামনেই সিনিয়র শিক্ষক ফরহাদ স্যারের সাথে জুনিয়র শিক্ষক অনুপম চক্রবর্তী ভিষন ঝগড়া জুড়ে দিয়ে অশালীন ব্যবহার শুরু করেন। ছাত্রনেতাদের ভর্তি বানিজ্য করতে দেয়া হবে না, শিক্ষকদের চাপে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বানিজ্য হারানোর কথা শুনে ছাত্ররা অনুপম স্যারের সাথে কথা বলে। অবশ্য তিনি প্রায় সময়ই তাদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন। অনুপম বাবু তাদের বললেন, তোমরা একটি প্রস্তাব নিয়ে অধ্যক্ষের নিকট যাও, পরে দেখা যাবে। একথা শিক্ষকদের কানে আসলে।
অধ্যক্ষের রুমে অন্য শিক্ষকদের সামনে ফরহাদ সাহেব তাকে জিজ্ঞাস করলেন, আপনি ছাত্রনেতাদের পরামর্শ দিতে যান কেন ?
আমি পরামর্শ দেই! কে বললো। তারা আমার নিকট জানতে চেয়েছে। আমি বলেছি দেওয়া হবে না। তারা কি করবে জানতে চাইলে তাদের বলেছি অধ্যক্ষের সাথে কথা বলতে। এতে অপরাধ কী? অনুপম বাবু পাল্টা জবাব দিলেন।
শুধু অপরাধ নয়, অনেক অপরাধের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন ফরহাদ সাহেব কিছুটা অভিযোগের সুরে বলে উঠলেন, আপনারা ছাত্রনেতাদের প্রশ্রয় দিয়ে আজ কলেজের এই অবস্থা। সে অধ্যক্ষের কাছে যাবে কি-না, মন্ত্রীর কাছে যাবে সেই পরামর্শ আপনি দেয়ার প্রয়োজন ছিল না। এমনিতেই তারা কারো কথা শোনে না। তার উপর আপনার এই পরামর্শ তাদের জন্য গ্রীন সিগ্নালের মতো কাজ করবে। এছাড়াও আপনি বলেছেন, তারা অধ্যক্ষের নিকট গেলে পরে আপনারা দেখবেন।
অনুপম বাবু চিৎকার করে উঠলেন, আমরা কলেজ জীবনে রাজনীতি করে এসেছি। আমার সাথে তাদের সুবিধা অসুবিধা নিয়ে আলোচনা করতেই পারে।
আপনি আলোচনা করুন, কিন্তু পরামর্শ দিবেন কেন? ফরহাদ সাহেবের একই কথায় অনুপম বাবু দাঁড়িয়ে গেছেন, হাঁত নেড়ে উচ্চস্বরে আপনারা জীবনেতো বই ছাড়া কোন দিকে তাকাননি, তাই দুনিয়ার আর কিছু বুঝার ক্ষমতা হয়নি। আমি কথা বলবো আপনি পারলে কিছু করেন।
অনুপম বাবু আপনি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন ফরহাদ স্যার রাগান্বিত হয়ে বলেন, আপনার মতো অনেকেই রাজনীতি করে এসেছেন। এখন আপনি শিক্ষক। সেই ভাবেই তাদের সাথে কথা বলতে হবে।
আপনিতো কোন দলের রাজনীতি করে এসেছেন আমরা জানি। ফরহাদ স্যার এবার আর নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে পারলেন না, মুখ বন্ধ করেন অনুপম বাবু। আপনি বন্ধ করেন, অনুপম বাবু পাল্টা ধমক দিয়ে উঠেন। আশপাশে বসা শিক্ষকরা তাদের থামানোর চেষ্টা করছিলেন আগে থেকেই। অনুপম বাবুর ধমক দিয়ে কথা বলার পর পরিস্থিতি আর স্বাভাবিক থাকলো না, শিক্ষকরা দুজনকে ধরে নিয়ে দুইদিকে চলে যান। এরই মধ্যে দুই জনের মধ্যে যে বাক্য বিনিময় হয় তা অনুমান করার ক্ষমতা বিধাতা সব স্বাভাবিক মানুষকেই দিয়েছেন। ফরহাদ স্যার পরবর্তিতে আবার অধ্যক্ষকে সে বিষয়ে নালিশ করলেও অধ্যক্ষ সুখ বাবু  নালিশকে আর সালিশে নিতে পারলেন না তার অতি কোমল নরম হৃদয়ের কারনে।
কিন্তু ঝামেলা শুরু হলো যখন কলেজের কেরানীর সাথে অধ্যক্ষের দূরত্ব তৈরি হতে থাকলো। অধ্যক্ষের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন আহমেদ করিম। কলেজের গভর্নিং বডি তাকে সেই দায়িত্ব দেয়। কিন্তু বছর খানেক কাজ করার পর অধ্যক্ষের পক্ষের প্যানেল নানা অজুহাতে আহমেদ করিমকে সরিয়ে দেয়ার দাবি জানাতে থাকে। অধ্যক্ষও কোন কথার মধ্যে নেই, কোন পক্ষের মধ্যেও নেই। আহমেদ করিমও পদ আকড়ে থাকার চিন্তা না করে সবার কাছে পদ তিনি ছেড়ে দিচ্ছেন বলে জানান। এতো দ্রুত পদ ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি হয়তো অধ্যক্ষের ধারানার মধ্যে ছিলনা তিনি বারবার করিম স্যারকে দায়িত্বে থাকতে বলেন। কিন্তু গভর্নিং বডির মাধ্যমে দায়িত্ব দেয়ারপরও কয়েক জনের অন্যায় দাবিতে অধ্যক্ষ সুখ বাবু কোন দ্বিমতপোষন না করেই নিশ্চুপ থেকেছেন যা করিম স্যারকে আহত করেছে বুঝা যায়। করিম স্যার একবাক্যেই ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত জানান। বাতাসে শোনা যায়, অধ্যক্ষের করিম স্যারকে সরিয়ে দেয়ার ইচ্ছে ছিল না। শুধু একটু চাপে রাখাই ছিল তার পরিকল্পনা। অসহায় ভাবে বাধ্য হয়েই কলেজে অধ্যক্ষের নতুন সহকারী হলেন ফরহাদ আহমদ।


আহমেদ করিম ছিলেন বাকপটু। কঠিন জিনিসও সহজ করে তুলতেন হাস্যরসের মাধ্যমে। কথা বলতে পারেতেন এবং কথার মাধ্যমে মানুষকে নিজের মধ্যে আটকিয়ে রাখতে পারতেন। অপরদিকে ফরহাদ আহমদ প্রচন্ড রকমে একগুয়ে। কথা কম বলেন এবং কথার পিঠে কথা জুড়তে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন। কথা এতোটাই ধীরে ধীরে বলেন যে তিনি একটি শব্দ উচ্চরণ করে অপর শব্দ উচ্চারণের মধ্যে চা শেষ করা যায়। ধীরে কথা বলার কারণে কথা শুনতে অনেকের ধোয্যচ্যুতি ঘটে। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই তার সাথে কেরানীর বিরোধ শুরু হয়। যদিও এই বিরোধ বেশ পুরোন। তার নিয়োগের পর কেরানীর চালাকিতে তার এমপিও আসতে প্রায় একবছর দেরি হয়। কেরানীর সব বিষয়ে তিনি খোঁজ খবর নেয়া শুরু করলেন। অধ্যক্ষ তাতে খুব একট অখুশি নন। কোন কোন সময় তাকে আমোদিত মনে হচ্ছে। একজনের পিছনে অন্যজন ব্যস্ত থাকবেন এবং দুজনেই তার কথা মতো চলবেন। তিনি সহকারী এবং কেরানী উভয় দিকেই ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে শুরু করেন। সহকারী ফরহাদ আহমদ কেরানীর সাথে বিরোধে নিজের সুবিধাজনক অবস্থানের জন্য এখন অধ্যক্ষকে বেশি সময় দিচ্ছে এবং অধ্যক্ষের সকল কাজে নিঃশর্ত সাহায্য-সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। অঘোষিত ভাবে অধ্যক্ষের সহকারী কেরানীর মতো হয়ে উঠলেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সহজচার্যে থেকে অধ্যক্ষের আজ্ঞাবাহী অতিনিষ্ঠাবান কেরানীর মতোই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। অপরদিক কেরানীও সহকারীর সাথে বিরোধে সুবিধা পেতে আরো বেশি করে অধ্যক্ষের কৃপায় ধন্য হতে উদগ্রিব। ফাইল নোট লেখা, টাকার পরিমান উল্লেখ করা, বিভিন্ন খরচের বিষয়ে হিসাবসহ সব বিষয়েই অধ্যক্ষ এখন অধিক সহযোগিতা পাচ্ছেন। পরীক্ষা কমিটি, ভর্তি কমিটি, ফরমপূরণ কমিটি, রেজিস্ট্রেশন কমিটি সবগুলোতেই এখন অধ্যক্ষের একছত্র আধিপত্য। অধ্যক্ষ ফাইল নোট লিখতে পারছেন ইচ্ছে মতো। কোন শিক্ষক টু শব্দটিও করতে পারেন না। আগে একটি কাজ করতে নানা ভাবে বাঁধার সম্মুখীন হতেন। সহকারীর পদ থেকে সরে যাওয়ার পর থেকে আহমেদ করিম কলেজের বিষয়ে ছাড় দিয়ে দিলে কলেজ আরো বেশি একপক্ষীয় হয়ে পড়ে। কলেজ একপক্ষীয় হয়ে যাওয়ার অন্য একটি কারণ হচ্ছে ভোটাভাটির মাধ্যমে সহকারী নির্বাচন। সহকারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুই জন প্রার্থী হয়েছিলেন। ফরহাদ আহমদ ও কুমকুম খাতুন। শিক্ষকদের ভোটাভুটির মাধ্যমে সহকারী নির্বাচনে ফরহাদ আহমদ জয় লাভ করেন। সবসময় উচ্চ কন্ঠ, ঠোটের অনিয়ন্ত্রন ব্যবহার, যাকে যা ইচ্ছা বলে ফেলার জন্য কলেজের সবচেয়ে সোচ্চার কুমকুম খাতুন পরাজিত হয়ে অনেকটা নিরব হয়ে যান। কলেজে সব বিষয়ে কথা বলা এবং কথা বলার সময় মারমুখী ভঙ্গি, ঝগড়ার মতো আওয়াজ, মুখনিসৃত শব্দের সাথে হাতের নাচানাচি, নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেই খড়গহস্ত এবং অর্থ প্রাপ্তিরদিকে তার সদা সতর্ক দৃষ্টি সবার নিকট তিনি ভীতিকর এক অনিশ্চিত চরিত্র। তার সবচেয়ে আপনা লোক সারিক আক্তার। কিন্তু টাকা প্রাপ্তির বিষয়ে সারিকা মেডামকেও একদিন আক্রমন করে বসলেন এই বলে ‘ আপনার সাহেবের উপরে-নিচে বহু আমদানি, আপনি পরীক্ষা কমিটির টাকা নিয়ে কি করবেন, এবার আমাদের দিয়ে দেন।’
একবার তার বিভাগেরই শিক্ষক ইদ্রিস আলী ডিপার্টমেন্টের কোন এক বিষয়ে হিসাব চাইলে তিনি কর্কশ ভাষায় চরম তর্ক জুড়ে দেন এবং হিসেব দেখাবেন না বলে সাথে সাথে জানিয়ে দেন। অবশ্য তার সাথে অনেক শিক্ষকও একমত অনার্স কোর্সের শিক্ষক আবার হিসাবে চাইবেন কেন। এদের শিক্ষক হিসেবেই গন্য করাই যায় না। ৪ হাজার টাকা মাসিক সম্মানীতে তারা চতুর্থ শ্রেণির তুল্যও নয়। তাদের যে সবার সাথে শিক্ষক মিলনায়তনে বসতে দেয়া হচ্ছে তাতেও অনেকে মনক্ষুন্ন। অস্পৃশ্য করুনার প্রার্থী হয়েই অনার্স কোর্সের শিক্ষকদের চলতে হবে এবং সকল অবহেলা আর বঞ্চনা তাদের গ্রহণ করতে হবে হাসি মুখে। যদিও এই অনার্স কোর্সের ছাত্রদের বেতন দিয়ে কলেজের আজ এই রমরমা অবস্থা। কিছুদিন পূর্বেও কলেজের ফান্ড ছিল কপর্দক শূণ্য। কলেজের বেতনের অংশ নেয়াতো দূরের কথা বসার জন্য ভালো চেয়ারটি পর্যন্ত ছিল না। চা দেয়া হতো পুরোন দাগযুক্ত কাপে। কখনো পাওয়া যেতে ঠুটি ভাঙ্গা কাপ। অনার্স কোর্স চালু করার পর কলেজের এই বাড় বাড়ন্ত। কিন্তু অনার্স কোর্সের শিক্ষকদের সামনে এমপিও ভূক্ত শিক্ষকরা আর্বিভ‚ত হলেন জমিদার-মহাজন রুপে। সকল বিভাগীয় প্রধান হলেন এমপিওরা। সকল হিসেব নিকেশ তাদের হাতে। তারা দয়া পরবশ হয়ে কিছু দিলে তারা পাবেন। অনার্সের শিক্ষক যতই সিনিয়র হোন না কেন, যেকোন বিষয়ে নতুন কোন এমপিওভূক্ত শিক্ষক এলে তিনি তার নিচে থাকবেন। একবার ইদ্রিস আলী অধ্যক্ষ সুখ বাবুর সাথে কোন এক বিষয়ে কথা বলার সময় অধ্যক্ষ বলেই ফেললেন আপনারা তো কিছুই না। যে সম্মান পচ্ছেন তাই বেশ। ইদ্রিস আলী অধ্যক্ষের সরল উক্তির পর কোন কথা বাড়ালেন না। তার নিরবতা অধ্যক্ষ সুখ রঞ্জন দাসের জন্য উপহাস তুল্য হয়ে দাঁড়ায়। অধ্যক্ষ নিজেকে আরো বলিষ্ঠ বুঝাতে একটু বিদ্রুপের হাসি দিয়ে ইদ্রিস আলীকে কষ্ট না পেতে বললেন। দেখুন কষ্ট দেয়া এবং নেয়া জানতে হবে। একটি কষ্ট হলো ভালো কাজ না করার জন্য এবং অন্যটি হলো মন্দ কাজ করার জন্য। জীবনে ভালো কাজের সুযোগ থাকার পরও না কারায় মানুষের মনে একধরনের কষ্ট থেকে যায়। মানুষের জন্য সমাজের জন্য কিছু না কারার কারনে অপরাধবোধ কাজ করে। যা প্রকাশ হয় না কিন্তু সর্বক্ষণ জাগ্রত থাকে। আরেকটি হলো অন্যায় অবিচার-অনিয়ম করার কষ্ট। নিজের অন্যায় অপরাধের জন্য কষ্ট পাওয়া। এই কষ্ট আমৃত্যু কুরেকুরে খায়। তুষের আগুনের মতো মাঝে মাঝে লাল হয়ে উঠে। আমি কষ্ট পাবো কেন ? আমিতো কোন অন্যায় করিনি, অনিয়ম বা অপরাধেও নয়। অন্যের অনিষ্টও চাইনি। তাহলে আমি কষ্ট পাব কেন ? যিনি অপরাধ করেছেন তিনি কষ্ট পাকগিয়ে। তবে আমি দুঃখ পাই অপরাধীদের কান্ডকারখানা দেখে। তারা যখন অপরাধ-নিয়ময় করে বিজয়ী সুখী মানুষের মতো অভিনয় করে। এক ধরণের আত্ন-প্রবঞ্চনা। কারণ একজন ব্যক্তি অন্য থেকে কি ধরণে লাঞ্চনা-বঞ্চনার শিকার হয়েছে তার সব গুলো হয়তো মনে রাখবে না, কিন্তু নিজে অন্যের সাথে কি কি অন্যায় করেছে তা মৃত্যুর পূর্বে পর্যন্ত ভুলতে পারবেন না। ইদ্রিস আলীর সব কথা অধ্যক্ষ বুঝতে পেরেছেন বলে মনে হলো না। শিক্ষক যারা বসা ছিলেন তাদের মুখেও কোন কথা নেই। সম্ভবত তারাও এসব বুঝাবুঝির মধ্যে নেই।
অনার্স কোর্সের শিক্ষকদের অপমান বা অবহেলার ক্ষেত্রে কেউ সরাসরি, কেউ পিছনে, আবার কারো মৌন সমর্থন। এব্যাপারে কারো হাতে দা, কারো পিছনের হাতে লাঠি আবার কারো অস্তিনে খঞ্জর এরকম অবস্থা। সেদিন অনার্স কোর্সর শিক্ষকরা বেতন বৃদ্ধির আবেদন করলে কুমকুম খাতুন, নাইম উদ্দিনসহ আরো দুই একজন ক্ষোভে সরাসরি বিরোধীতা করেন। কিন্তু বিষয়টি ইউএনও এর নিকট চলে গেছে জানতে পেরে তারা নতুন ব্যবস্থা করলেন। কলেজের নিরীহ শিক্ষক কারো কাছেও নেই পাছেও নেই শান্তশিষ্ট মসুদ ভূইয়া । ধীরে ধীরে কথা বলেন এবং কোন ঝনঝাটে তিনি নেই। তবে সব কাজে তার অদৃশ্য উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। তিনি কখানো অনার্স কোর্সের শিক্ষকদের বেতন ভাতা নিয়ে কোন কথা বলেন না। বরং অনার্স কোর্সের শিক্ষকদের সাথে দেখা হলে তাদের দাবি যে যৌক্তিক সে ব্যাপারে আকুন্ঠ সমর্থন প্রকাশ করেন। সেদিন বিকেলে মসুদ স্যারকে উপজেলা কমপ্লেক্রো দেখা গেলো। পরে জানা গেলো অফিস ওয়ার্কে পারদর্শি (লেনদেনে) মসুদ ভূইয়া ইউএনওকে বুঝিয়ে অনার্স শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর বিষয়টি বন্ধ রাখাতে সক্ষম হয়েছেন। এই বিশেষ কাজের জন্য পরে তিনি সকলের অশেষ কৃতজ্ঞতায় ধন্য হোন। এমন অনন্দিত হয়েছিলেন সবাই আরেক বার যখন ইদ্রিস স্যারের বিয়ের একটি প্রস্তাব এসেছিল।


সেই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে কলেজে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। মেয়ে রুপবতী, শিক্ষিত এবং উচ্চ সামাজিক মর্যাদা সম্পূর্ণ পরিবার। মেয়ের বাবা একটি স্বনামধন্য কলেজের অধ্যক্ষ। কলেজের প্রভাবশালী আলম সরকার স্যারের জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়েছি, গৃহীত হয়নি। ইদ্রিস স্যারের বিয়ের জন্য এই প্রস্তাব আসায় টক অফ দ্যা টিচারে পরিনত হয়। শিক্ষকদের নিকট অনেকটা ইজ্জতের উপর হাত এধরণের অবস্থা। ইদ্রিস স্যারের অনুপস্থিতিতে তার হবু শ্বশুর একদিন অধ্যক্ষের সাথে দেখা করতে এলে অধ্যক্ষ গল্পেগল্পে শুনিয়ে দিলেন অতিসামান্য সম্মানী দেই, তবে সরকারিকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। অধ্যক্ষের এধরণে কথায় তিনি খুব একটা খুশি হয়েছেন বলে মনে হয় না। তিনি বলেই দিলেন, আপনাদের যাদের সাথেই কথা বলেছি সবাই একই কথা বলেছেন। দেখুন, আমি একজন ভালো মানুষ খুঁজছি। কাজের থাকলে যেখানেই হোক ব্যবস্থা করে নিবে। এটা তার মনের কথা না, বিরক্ত হয়ে বলছেন বুঝা যায়নি। বিষয়টি আর এগোয়নি এখানেই খতম হয়ে যায়। বিজয়ীর বেশে মহানন্দে অনেকে ইদ্রিস সাহেবের সামনে কপট দুঃখ প্রকাশ করেন। দিনেদিনে বেলা যে চলে যাচ্ছে ইদ্রিস সাহেব। বিয়ে এক জায়গায় হলো না বলে মন খারাপ করে বসে থাকলেতো হবে না। কি বলেন খান স্যার। মসুদ ভূইয়া ইদ্রিস স্যারের বিয়ের বিষয়টি শিক্ষক মিলনায়তনে এভাবেই একদিন উত্থাপন করেন। ইদ্রিস সাহেব শোকেকাতর, শোক পালন করছেন। তা এটাকে শোকবর্ষ বানইয়ে ফেলায়েইন না আবার ইদ্রিস সাহেব। টিপন্ন কাটেন হরিপদ বাবু। না হরিপদ বাবু এটা তুমি ঠিক বললে না, ইদ্রিস সাহেব যিনি গেছেন তারই মতো একজনকে বিয়ে করে প্রমান করবেন তিনি বিবাহের যোগ্য। খান স্যার যুক্ত করলেন। বিয়ে নিয়ে রসালো আলাপ জমে উঠেছে। ইদ্রিস সাহেব ক্লাসে যাবেন, কলম, খাতা হাতে নিলেন, চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, জীবনকে বেঁধেছি সত্য আর সুন্দরের সাথে। সে যেখানেই যায় আমি খুশী। ও-মা; আমাদের ইদ্রিস সাহেব দেখি ফিলোসফার হয়ে যাচ্ছেন দেখি। ও হবিপদ বাবু শোকটা একটু বেশি হয়ে গেলো নাতো। দর্শনের আলম সরকারের একথায় পুরো মিলনায়তনে হাসির রোল পড়লো। কোন উত্তর না দিয়েই বেরিয়ে গেলেন ইদ্রিস সাহেব। ইদ্রিস সাহেব বেরিয়ে যাওয়ার পর আরো কিছুক্ষণ বিয়ের আলোচনা ও হাসির ফল্গুধারা বহমান থাকে।
পরবর্তিতে স্টাফ মিটিং-এ হিসাব চাওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করেন ইদ্রিস আলী। কুমকুম খাতুন সেখানেও বলেন তিনি দেখাতে বাধ্য নয়, তিনি হিসেব দেখাবেন না। অন্য শিক্ষকরাও মৌনতা অবলম্বন করলেন। অধ্যক্ষ বললেন হিসেব দেখাতে বাধ্য নন মেডাম ? ইদ্রিস আলী কয়েক মূহূর্ত মাথা নিচের দিকে দিয়ে বসে থাকলেন তার পর বললেন, তাহলে স্টাফ মিটিং এর সিদ্ধান্তে লিখে রাখুন কোন বিভাগের শিক্ষকের নিকট বিভাগের হিসেব নিকেশ দেখাতে বিভাগীয় প্রধান বাধ্য নন। কোন শিক্ষক চাইলেও দেখতে পারবেন না। অধ্যক্ষ একটু চিন্তায় পড়ে গেলেন মনে হলো। কিছুক্ষণ চিন্তা করে পরে বললেন আচ্ছা বিষয়টি পরে আমি দেখছি। এই দেখা অধ্যক্ষ শেষ করতে পারলেন না, পরীক্ষা কমিটি নিয়ে নতুন আলোচান শুরু হয়ে গেলো। পরীক্ষা কমিটি গঠন নিয়ে নতুন দাবি নিয়ে এসেছে বিপক্ষ দলের। তাদের দাবি সকল পরীক্ষা কমিটি করতে হবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমোতাবেক শিক্ষকদের পদবী অনুসারে ধারাবাহিক ভাবে কমিটিতে আনতে হবে। অবশ্য পরীক্ষা কমিটি গুলো মুখবন্ধ রাখার একটি শক্তিশালী অস্ত্র। যিনি একটু উচ্চবাচ্য বা কোন বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন তাকেই একটি কমিটিতে সদস্য হিসেবে নিয়ে নেয়া অধ্যক্ষের একটি সাধারণ কৌশল। অধ্যক্ষের কক্ষে তুমুল হট্টগোল।
ইন্টারন্যাল পরীক্ষা গুলো রোটেশন অনুসারে হোক। কিন্তু পাবলিক পরীক্ষার কমিটি গুলো অধ্যক্ষ তার পছন্দ মতো শিক্ষকদের নিয়ে করবেন। কারণ এসব পরীক্ষায় কোন সমস্য হলে অধ্যক্ষ বিপদে পড়ে যাবেন। দর্শনের আলম সরকার স্যারের কথা শেষ হতে না হতেই তীব্র প্রতিবাদ করে উঠলেন ইতিহাসের মকদ্দস আহমদ। এসব সুবিধাবাদী কথা। আপনি একজন শিক্ষক দেখান যিনি এই দায়িত্ব পালনে অক্ষম। মকদ্দস স্যারের গলার আওয়াজটিই এমন যে তিনি স্বাভাবিক ভাবে কথা বললেও মনে হবে কথার ঝড় বইছে। তাছাড়া কোন একজন যদি একবার ব্যর্থ হোন তাহলেতো আপনি তাকে বলতে পারবেন আপনাকে দিয়ে হবে না। সবাই মকদ্দস আহমদকে সমর্থন করলেন। উচ্চকন্ঠী কুমকুম খাতুন তার স্বভাবসুলভ সাড়াশি আক্রমন করেন। সব একা খাওয়ার চক্রান্ত ছাড়া কিছুই নয়। হয় নিয়মে আসেন না হলে আমরা ইউএনও এর নিকট–এতটুকু বলেছেন মাত্র, আলম সরকার কানে কানে শুধু বললেন সুযোগ দিয়ে দিচ্ছেন অনার্সের–। সাথে সাথে কুমকুম খাতুন সামান্য থেমে ‘যাব না। আমরা যাব না, আপনার বিবেকের উপর ছেড়ে দিতে চাই। সভা শেষে বের হতে হতে একাউন্টিং এর সাইফ উদ্দিন বিড়বিড় করে আপন মনে বলে উঠলেন, অনার্স কোর্সের শিক্ষকদের যত বঞ্চিত করা যাবে কলেজের ফান্ডটা তত ফুলেফেপে নাদুসনুদুস হয়ে উঠে। এতে অনেকের সাচ্চা ইনকাম বাড়ে। তার এই দুঃখবোধের কারণ অবশ্য অন্য জায়গায়। তার হাত দিয়েই শুরু হয় তার একাউন্টিং বিভাগের কার্যক্রম। পরিশ্রম, আবেগ-ভালোবাসা আর অনেক যতœ নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন তার বিভাগ। তাকেই তার বিভাগের প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল নানা নিয়মের বেড়াজালে ফেলে। তিনি হলেন তার বিভাগে প্রথম নিয়োগ প্রাপ্ত শিক্ষক। অন্যজন ফারহানা হক পরে আসেন। যদিও এমপিও এর দিক দিয়ে ফারহানা হক সিনিয়র। ফারহানা হক অন্য প্রতিষ্ঠানে সুযোগ সুবিধা ভোগ করে এসে নতুন প্রতিষ্ঠানে অন্যের কষ্টের সাজানো সংসারের কর্তা হয়ে বসবেন তা হতে পারে না। অধ্যক্ষ এসব বিষয়ে কোন দায়িত্ব না নেয়ায় সাইফ উদ্দিন হলেন শিকার। পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে নিয়ম করা হয় যিনি এমপিও এর দিক থেকে সিনিয়র তিনি হবেন বিভাগীয় প্রধান। সুতরাং নিজের সাজানো সংসারে সাইফ উদ্দিন হলেন পেয়াদা।
এরমধ্যে একদিন কলেজের ব্যংক হিসেবের একটি শিট ফরহাদ আহমদের হাতে পড়ে যায়। তিনি সেখানে অনার্স প্রথম বর্ষের ভর্তির টাকার ব্যাংক হিসেবের সাথে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের সংখ্যার মিল নেই দেখে আশ্চার্য হোন। প্রায় সাড়ে ৫ লক্ষ টাকার গড়মিল। তিনি বিষয়টি অধ্যক্ষকে দেখিয়ে এর কারণ অনুসন্ধানের জন্য বলেন। অধ্যক্ষ প্রথমে একটু গাইগুই করলেও পরে কেরানীকে ডাকলেন। কেরানী বিষয়টি নানা ভাবে বুঝানের চেষ্টা করে। ফরহাদ আহমদ তো খুশিতে আত্নহারা। যেন হাতে আসমান পেয়েছেন। ফরহাদ আহমদের চেহারা নতুন আশা ও সংকল্পের দীপ্তি। কেরানীকে এবার সায়েস্তা করা যাবে। বিরাট অংকের টাকার হেরফের এবং ব্যাংকের একাউন্ট শিটের মাধ্যমে প্রমানিত। শাখাওয়াত সাহেব বিষয়টি আর অস্বীকার করতে বা লুকাতে পারবে না। কথায় আছে কাছিম আর ব্যং একবার কামড়ে ধরলে মেঘ না ডাকলে না-কি ছাড়ে না। ফয়সল আহমদের মতো একগুয়ে মানুষ যখন দাঁতহীন কাছিমের মতো ধরেছেন তখন আর মেঘ ডাকা নয়, বাজ্রাঘাত হলেও তিনি ছাড়বেন না এটা পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে।


কলেজে এমনিতেই নানা সমস্য। ছাত্র নেতারা উৎপেতে আছে, শিক্ষকদের অন্য গ্রুপটিও সুযোগের অপেক্ষায়। ব্যাংকের বিষয় বেশি জানাজানি হলে আমাদেরই ক্ষতি। বিষয়টি নিজেরা বসে শেষ করা উচিত। পরেরদিন শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন অধ্যক্ষ সুখ রঞ্জন দাস। শিক্ষকরা বিষয়টি নিয়ে ইতস্তত আলোচনা করতে থাকেন। কিছু সময় পরে নাইম উদ্দিন ও অনুপম চক্রবর্তী অধ্যেক্ষের প্রস্তাবকে সমর্থন করে বিষয়টি কলেজেই শেষ করার সিদ্ধান্ত নিতে বলেন। এই প্রস্তাবে অন্য শিক্ষকদের কেউ জোরালো, কেউ মৌন সমর্থন, কেউ কথা বলা থেকে বিরত থাকেন। তবে ফরহাদ আহমদ ইনিয়ে বিনিয়ে অধ্যক্ষকে নাও বলেন না, আবার হ্যাঁও না।
দ্রুত সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি শেষ না করায় কেরানী সাখাওয়াত হোসেন অধ্যক্ষের উপর চটতে থাকেন। বিষয়টি একটি ভুলের কারণে হয়েছে তা আপোষেই অধ্যক্ষ শেষ করতে পারেন, সাখাওয়াত হোসেন প্রায় সময়ই তার বিশ্বস্ত সিনিয়র শিক্ষকদের এসব কথা শোনাচ্ছেন। সাধারণত তিনি আগ বাড়িয়ে কারো সাথে কথা বলেন না এবং শিক্ষকরাই বরং তার সাথে সুসম্পর্ক রাখতে মাঝে মাঝে তার টেবিলের সামনে গিয়ে কুশল বিনিময় করেন। এখন তার যেচে কথা বলায় বুঝা যায় দীর্ঘ চাকুরী জীবনে তিনি কখনো এমন বিপদে পড়েননি। নিজের হাত ও মাথার উপর তার অগাধ বিশ্বাস। এই হাত ও মাথা দিয়ে তিনি এমন কোন কাজ বাকি রাখেননি যা একজন কেরানী করতে পারে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বোর্ডর সাথে তার দরহরম মহরম সম্পর্ক। যেকোন কাজ তিনি দ্রুত করে আনতে পারেন। তিনিও অধ্যক্ষের মতোই হিসেব করে পা বসান এবং কখনো রাগ করেন না। কোন ছাত্র বা শিক্ষক যদিও তার সাথে কোন কারনে উচ্চবাচ্য করেন তবে তিনি কানে তুলো আর পিঠে কুল দেয়ার নীতি মেনে চলেন। কিন্তু পরবর্তিতে সুযোগ বুঝে বোর্ড, ডিজি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাগজে তিনি অত্যন্ত নির্মহ দুর্বৃত্তিপূর্ণ চিত্রে তার বিষাক্ত কামড় বসান। একবার এক অনার্স কোর্সের ছাত্র কি এক বিষয়ে বেশি কথা বলেছিল। তিনি তার সভাবসিদ্ধ নরম গলায় অপারগতা প্রকাশ করেন। অনার্সের টিউটোরিয়ালের যে ২০ নম্বর কলেজ থেকে দেওয়া হয় সেই নম্বর ডিপার্টমেন্ট থেকে অফিসে পাঠানো হয় এবং অফিস থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেই করা হয়। সেই ইমেইলে ছাত্রটিরে টিউটোরিয়ালে ৮ দিয়ে রাখেন সাখাওয়াত হোসেন। একই ভাবে তিনি কখনো নম্বর, কখনো মায়ের বা বাবার নাম, কখনো বানান ভুল পাঠিয়ে দিয়ে পাপের পাশচিত্ব করান তার বিরুদ্ধচারীদের। আবার কোন শিক্ষক তার মতের বাইরে গেলে তাকেও সায়েস্তা করতেও তার ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। বোর্ড বা ডিজির বা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সার্বক্ষনিক যোগাযোগকে ব্যবহার করেন। তা না হলে অবৈধ সুবিধা নেয়া ছাত্র নেতাদের ব্যবহার করেন। তবে তিনি খুবই সতর্ক কোন কাজই হুড়হুড়ি করে করেন না। চুপ করে বসে থাকেন এবং সুযোগ আসলে নিরবে তার ব্যবহার করেন। ফরহাদ আহমদের এমপিও দেরি করার পিছনেও তার অতি সামান্য মাথার ব্যবহার ছিল। সার্বক্ষণিক পানের কোটা সাথে থাকে এবং রসালো পানে মুখ থাকে ভর্তি। তার শান্ত থাকা ও নির্দয় ব্যবস্থা নেয়ার পিছনে ধীরে ধীরে পান চাবানের কোন রহস্য আছে কিনা আমার সবসময় মনে হয়।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা কর্মচারীদের কেউই তার মুখোমুখি হতে চান না এবং তিনিও সবার উপরে একধরণের অদৃশ্য প্রভাব বিস্তার করে চলেন। কিন্তু এই ঘটনায় তাকে একটু চিন্তিত মনে হচ্ছে এবং নিজের বিশ্বাসে কিছুটা চিড় ধরেছে বলে ঠাওর করা যায়। নিজের চেয়ারে বসে পান চাবাতে চাবাতে মাঝে মাঝে তিনি কিছুটা বিমর্ষ এবং অন্যমনষ্ক হয়ে যাচ্ছেন। তিনি অধ্যক্ষের সাথে অসহযোগিতা শুরু করলেন। হিসাব করা, হিসাব প্রদান বা হিসাব রাখার ক্ষেত্রে সে কালক্ষেপন, নিয়মকানন দেখাতে শুরু করে। তিনি যতই অসহযোগিতাই করেনা কেন অধ্যক্ষ তার উপর কখনো রাগের অভিনয় করলেও রাগ করতে পারেন না। গত ৭/৮ বছর থেকেই সবাই এটা দেখে আসছেন। অধ্যক্ষ সবকাজেই সাখাওয়াত সাহেবকে নিয়েই করেন এবং কখনো তাদের মধ্যে কোন উচ্চবাচ্য হলেও তা দ্রুত মিটে যায়। তবে এসব বাতচিতে সাখাওয়াত সাহেবকেই বেশি শক্তিশালী মনে হতো এবং অধ্যক্ষকে নিজে গায়ে পড়ে তার সাথে আপস করতে দেখা যেত। ফরহাদ আহমদ বিষয়টি সমাধান না করে বরং মাঠ গরম করতে থাকেন এবং কলেজ ও কলেজের বাইরেও বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। ফরহাদ আহমদ এব্যাপরে থানায় একটি জিডি করতে অধ্যক্ষকে চাপ দেয়া শুরু করলেন। কিন্তু অধ্যক্ষ কোন ভাবেই বিষয়টি বেশিদূর গড়াতে দিতে আগ্রহী নন। বিষয়টি যে আর নিয়ন্ত্রণে থাকছে না তা সাখাওয়াত সাহেবের অভিজ্ঞ মাথা অনুমান করতে পারছে এবং এতে তার চাকুরীচ্যুতি ঘটাতে পারে সে বিষয়ে তার সাম্যক ধারনা রয়েছে।
একদিন কলেজ ছুটির পরে কয়েকজন শিক্ষক তখনো আছেন তাদেরকে পেয়ে কথা শুরু করেন সাখাওয়াত সাহেব। তারা আমাকে ধরতে নাওয়া-খাওয়া হারাম। কিন্তু অতি সাম্প্রতি তারা অনার্স প্রথম বর্ষের ইনকোর্স পরীক্ষা না নিয়েই পরীক্ষার খরচ বাদ ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা তুলে আত্নসাত করেছেন। সাখাওয়াত সাহেব কি বলছেন প্রথমে বুঝতে পারেননি শিক্ষকরা। কি বললেন বলে আবারো জিজ্ঞাস করলেন তারা। সাখাওয়াত সাহেব আবারো এই কথা বলতেই শিক্ষকরা অর্থপূর্ণদৃষ্টিতে মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে থাকেন। একজন আরেক জনকে পড়তে চাইছেন। মসুদ ভ‚ইয়া ও অনুপম চক্রবর্তী অধ্যক্ষের আপনা লোক হিসেবে পরিচিত। তারা সামনে থাকায় অন্য শিক্ষরা এ বিষয়টি নিয়ে আর কথা বাড়ানোর সাহস করেননি। তবে তাদের যদিও অধ্যক্ষের সাথে দহরমমহরম। কিন্তু সময় মতো তারা পিছনে দৌড়াতে পারেন। কাঁকড়া যেমন সামনে পিছনে সামন দ্রুত দৌড়াতে পারে। কাঁকড়া চরিত্রের মানুষ প্রয়োজনে ইউটার্ন নিয়ে একজনকে ছেড়ে অন্যজনের দিকে দ্রুত চলে যায় এবং তাদের তোষামোদী সাড়াশি দিয়ে নতুন টার্গেটকে এমন ভাবে চেপে ধরে যে তিনি লাথি দিয়েও ছাড়াতে পারেন না।
খবরটি চাউর হতে খুব সময় লাগেনি। পরের দিন অধ্যক্ষ একটু অপ্রস্তুত অবস্থায় কলেজে আসলেন। তাকে আগের মতো স্মার্ট মনে হচ্ছে না। তার সান্ত সৌম্য চেহারায় কালো মেঘে সমাকীর্ণ। শিক্ষক, কর্মচারীরা কানাঘুষা করছেন। কানে কানে তিনিও তা শুনতে পাচ্ছেন না এমন নয়। সাখাওয়াতের বিষয়টি নিচে ফেলে অধ্যক্ষের ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা আত্নসাতের আলোচনা সামনে চলে আসলো। দফায় দফায় ফরহাদ আহমদ এবং কেরানী সাখাওয়াত সাহেবের সাথে বৈঠক হচ্ছে। বিকেলে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাখাওয়াত সাহেব শিক্ষকদের বললেন সবুর করেন শেষ না করলে আরো জানতে পারবেন। আমাকে ফাঁসাতে চাইছেন আমিও রাখবো না। প্রতিবছর ছাত্রনেতাদের অবৈধ সুবিধা দিচ্ছেন তারা। ভর্তি বানিজ্য ও ফরমপূরণে অবাধ বানিজ্য সুবিধা দিয়েছেন ছাত্রনেতাদের। শিক্ষকদের মধ্যেও এক অসীম আগ্রহ। দীর্ঘদিন পরে যেন ঐশী বানীর মতোই এক সুখবর পেলেন তারা। চালিয়ে যান আপনি একা কেন দোষী হবেন, সাখাওয়াত সাহেবকে অভয় দেন অনেকে।


পরেরদিন অধ্যক্ষ ও তার সহকারী ফরহাদ আহমকে সরাসরি অভিযুক্ত করে শিক্ষকরা কথা বলতে শুরু করলেন। যদিও অধ্যক্ষ এবং ফরহাদ আহমদ অভিযোগটি সমানে অস্বীকার করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে আজ আবার সাখাওয়াত সাহেব নতুন করে জানালেন কলেজের সিড়ি ও নামাজ ঘর তৈরিতেও টাকা নয়ছয় হয়েছে। শিক্ষকদের আলোচনায় পালে নতুন বাতাস লাগলো। টাকা উত্তোলন এবং নয়ছয়ের গল্প শিক্ষকদের প্রতিদিনের মুখরোচক আলোচনায় পরিনত হলো। শিক্ষক মিলনায়তনে প্রতিদিনের হাস্যরসের উপলক্ষে হয়ে উঠলো এই আর্থিক অনিয়মের খবর। অধ্যক্ষ থেকে কোন জবাব না পেয়ে কয়েকজন শিক্ষক ইউএনও এর সাথে দেখা করে অভিযোগ করে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। শিক্ষকরা এভাবে অভিযোগ করে বসবেন সে বিষয়টি কোন ভাবেই কল্পনায় ছিলনা কেরানী সাখাওয়াত সাহেবের। পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ কলেজে বসেই শেষ হয়ে যাবে বলে ধারা ছিল তার। ইউএনও এর নিকট চয়ে যাওয়া এবং ইউএনও বিষয়টি নিয়ে বসার তারিখ দিয়ে দেওয়ায় সাখাওয়াত হোসেন নিজের মেধা ও মগজের উপর বিশ্বাস হারিয়েছেন মনে হচ্ছে। এখন কথা বলার সময় অতিরিক্ত কথা বলছেন এবং কথার খেই হারিয়ে ফেলছেন।
ঘটনা আরো জটপাকালো এবং সমস্যার সেরের উপর মন উঠলো যেদিন অধ্যক্ষ কলেজে আসলেন না, কিন্তু বেয়ারার রেজুলেশন বই ও আনুসাঙ্গিক কাগজপত্রসহ তার ব্যাগ নিয়ে কলেজে চলে আসে। অধ্যক্ষ বেয়ারারকে ব্যাগ নিয়ে কলেজে যাওয়ার জন্য বলে তিনি একটু ফার্মেসীতে যান। কিন্তু এর পর দুইদিনই তিনি আসলেন না। ফার্মেসীতে মাথা ঘুরে পড়ে গেলে তাকে সাথে সাথে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সহজ সরল মানুষ অধ্যক্ষের কষ্টের মধ্যে একটি মাত্র কষ্ট একমাত্র ছেলে শিবাকে নিয়ে। এমবিবিএস পাশ করারপর মেয়েটাকে ভালোয় ভালোয় পার করতে পারলেও ছেলের ব্যাপারে তিনি দুশ্চিন্তাগ্রস্থ। সারা বছরই তার অসুখ বিসুখ লেগেই থাকে। এই আষাড়ের মেঘের মতো। এই ভালোতো এই খারাপ। অনেক ডাক্তার, বৈদ্য, সাধুকে দিয়ে তার চিকিৎসা করিয়েছেন। দৌড়াচ্ছে খেলছে স্কুলে যাচ্ছে। হঠাৎ দেখা গেলে শুয়ে আছে। কি হয়েছে শরীর খারাপ। স্কুলে গেলেও পড়ালেখা করতে পারে না। চাপ দিলেই তার অসুখ আরো বেড়ে যায়। দেখতে সুস্থ স্বাভাবিক কিন্তু বয়স হয়ে গেলেও এখনো এসএসসি পরীক্ষাটাও দেওয়ানো যায়নি। গলায় মাদুলি, হাতে নানা সুতলি রাখিবন্ধন। তার পরও কোন ফলাফল নেই।
দুইদিন পরে কলেজে আসলেন, ফার্মেসী থেকে তাকে হাসপাতালে নেয়ার মধ্যে ঘটনা কী জানাতে সব শিক্ষক অধ্যক্ষের রুমে। অধ্যক্ষ সুখ বাবুর শালা নিহার আগের দিন রাতে বাসায় এসেছিলেন। রাতে খাবার খাওয়া শেষে গল্প করার সময় ছেলেকে বলেছিলেন রাতের ঔষধটা দেওয়ার জন্য। শিবা সুখ বাবুর হাতে রাতের ঔষধ তুলে দেয়। ঠিক সেই সময়ই বিদ্যুৎ চলে যায়। টেবিলের পাশেই একটি কাগজের উপর ঔষধটি রেখে মোবাইলের ফ্লাস অপেন করেন তিনি। একই সময় শিবাও তার ঘুমের ঔষধটি সেই ঔষধের পাশে রেখে চার্জ লাইট জ্বালাতে যায়। এর মধ্যে তিনি তার নিজের ঔষধ রেখে শিবার ঔষধ এবং শিবাও আলোআধারের মধ্যে সুখ বাবুর ঔষধ খেয়ে ফেলে। সকালে অধ্যক্ষ সুখ বাবু আর ঘুম থেকেই উঠতে পারছিলেন না। কিন্তু কমিটির জরুরী মিটিং থাকায় তিনি কোন রকমে বেরিয়ে আসেন। কলেজে যাওয়ার আগে একবার ফার্মেসীতে রক্তচাপটা দেখতে চেয়েছিলেন। এর মধ্যে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান।
তিনি কলেজে না আসায় সেদিন কমিটির সভায় হয়নি। কিন্তু রেজুলেশন বইটা অতি সচেতন ইকরাম স্যার, কুমকুম মেডাম অধ্যয়ন করেনেন। এসময় তাদের হা করা মুখ আর বিষ্ফোরিত চোখ দেখে মনে হয়েছে তারা এখনই জ্ঞান হারাবেন এবং এখনই জরুরী সেবাদানকারীদের ডেকে তাদের নির্দিষ্ট জায়গায় পাঠাতে হবে। মুখে পানি ছিটানোর পর হুশ ফিরলে মানুষ যেমন প্রথমেই উন্মুখ হয়ে থাকা দর্শকদের বলেন আমি কোথায় তেমনি তারা শুধু একটি শব্দই উচ্চারণ করে বলেন উঠলেন; ডাকাতি। কি হয়েছে ; জানালেন, দুটি বিষয়ে অনার্স কোর্স খোলার জন্য কলেজের ফান্ড থেকে সাড়ে ৬ লক্ষ টাকা তোলা হয়েছিল। তিনি রেজুলেশনের একটি মিটিং এ দেখিয়েছেন দুটি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করা সম্ভব না হওয়ায়, সেই টাকা একাউন্টে ফেরত দেয়া হয়েছে। কিন্তু আদতে টাকা ফেরত দেয়ার কোন ঘটনা ঘটেনি। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরও অধ্যক্ষ নির্বিকার চিত্রে অস্বীকার করে যাচ্ছেন এবং টাকা একাউন্টে জমা হয়েছে বলে জানিয়ে দেন।
অবশ্য যেকোন সমস্য সমাধানে অধ্যক্ষ সুখ রঞ্জন দাসের শেষ একটি অস্ত্র রয়েছে। যা তিনি বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। কোন রাগ যেমন নেই তেমনি স্বার্থের ব্যাপারে তার কোন মান অভিমানও নেই। রাতে সবার অলোখ্যে অতিগোপনে পদ স্পর্শের রীতিনীতি তার ভালো ভাবে রপ্ত। কলেজের ছাত্রনেতারা অধ্যক্ষের সানুগ্রহে কলেজে ভর্তি বানিজ্য করলেও তারা অধ্যক্ষের সাথে মাঝে মাঝে একআধটু অসৎ ব্যবহার করেই ফেলে। তখন অধ্যক্ষ বাধ্য হয়েই তাদের আরো সুযোগ বাড়িয়ে দেন। এই মাস চারেক আগে তাদের ক্ষিদে মিটাতে গিয়ে শিক্ষকদের বেতন বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হলে বলা যায় দেউলিয়া হয়ে যাওয়া। তখন তিনি একটু টাইট দিতে গেলে ছাত্রনেতারা আরো বেশি টাইট আচরণ শুরু করে। গালিগালাজ থেকে তুই তুকারি সবই অধ্যক্ষের উপর বর্ষিত হতে থাকে। ছাত্রনেতাদের বাগে আনতে না পেরে অধ্যক্ষ শেষে তাদের নেতাকে ম্যানেজ করতে রাতের আধারে পদ স্পর্শ প্রদ্ধতি ব্যবহার করেন। সাখাওয়াত সাহেবে সাথে আগেও বিভিন্ন বিষয়ে তার বিরোধ হলেও তা বেশি দূর গড়াতে দিতেন না। রাতে হোক বা কোন সুবিধা দিয়ে হোক সেই সমস্যা সমাধান করে ফেলতেন। এবারও রাতের পদ্ধতিই হোক আর দিনের পদ্ধতিই হোক তিনি সমস্যার সমাধান করে নিতেন কিন্তু ফরহাদ আহমদের কারণে সেই কাজটি হচ্ছে না। ফরহাদ আহমদ সহকারী হওয়ার পর অধ্যক্ষের মধ্যে যে উৎসাহ ছিল তা এখন আর তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
ইউএনও অফিসে সবাই বসলেন পরের সপ্তাহে। পরিচালনা কমিটির সদস্য, সিনিয়র শিক্ষক এবং অধ্যক্ষ, তার সহকারী ফরহাদ আহমদ ও কেরানী সাখাওয়াত হোসেন। ইউএনও কথা শুরু করলেন সাখাওয়াত সাহেবের বিষয় নিয়ে। সাখাওয়াত সাহেব দোষ স্বীকার করে নেয়ায় তার দীর্ঘ চাকুরী জীবন এবং বয়স বিবেচনা করে তার বিরুদ্ধে মামলায় যাওয়ার বিষয়টি বাদ দেয়া হয়। কেরানী ৬ মাসের মধ্যে টাকা ফেরত দিবেন বলে ৩শ টাকার স্টাম্পে লেখা পড়া হবে এবং এই দুর্নীতির জন্য তাকে কলেজের সব ধরনের আর্থিক বিষয় থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। পরে অধ্যক্ষের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হল। অধ্যক্ষ তার স্বভাব সুলভ বোকা বোকা, ভীতু, লাজুক চেহারা নিয়ে বসে আছেন।
পরীক্ষা না নিয়েই পরীক্ষার খরচ দেখিয়ে ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা তুলে আত্নসাত করার অভিযোগ উঠেছে এব্যাপারে আমাদের বলুন। ইউএনও শান্ত ও বিনয়ের সাথে একথা জানতে চান।
টাকাটা কলেজের পরীক্ষার খরচ দেখিয়ে তোলা হয়েছিল কিন্তু কলেজের অন্য উন্নয়ন কাজে লাগানো হয়েছে। উন্নয়ন কাজের জন্য আবারো ফাইনোট তৈরি করতে হবে এবং উন্নয়ন কাজের পরিধি ও ব্যয় উল্লেখ করে কাজের ইস্টিমিট তৈরি করতে হবে। এতে সময় লাগবে তাই পরীক্ষার কথা বলেছি। অধ্যক্ষ সুখ বাবু বললেন।
আপনি মিথ্য তথ্য দিয়ে টাকা তোলার কোন প্রয়োজন ছিল না। আপনি ফাইনোটে স্বাক্ষর নেয়ার সময় আমাকে অবগত করা উচিত ছিল। এই কথা তখনও বললেও তো পারতেন। আর কলেজের উন্নয়ন কাজের জন্য খরচ করতে হলেও একটি নিয়ম আছে। উন্নয়ন কাজের ব্যায়ের সুনির্দিষ্ট হিসেবটা তো এখন নিয়ে আসলেন না।
এমন একজন মানুষ সেখান উপস্থিত কলেজের নাড়ি নক্ষত্রের খবর যিনি রাখেন এবং অধ্যক্ষ সুখ বাবুর প্রতিটি রগ তিনি চেনেন। কখন তিনি কি বলবেন আগেই বলে দিতে পারেন। কেরানী সাখাওয়াত হোসেন। অধ্যক্ষ যেসব কাজের কথা বলছেন সেসব কাজের ব্যয়ের হিসেব তিনি দেখিয়ে দিলেন এবং সেসব ব্যয়ের জন্য আলাদা টাকা উঠানো হয়েছে তারও প্রমান দিলেন।
অধ্যক্ষ কিছু সময় বাকরুদ্ধ হয়ে থাকলেন। নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়েছেন মনে হচ্ছে। নিজের বোকাবোকা লাজুক চাহনি, সহজ সরল চেহারার আড়াল সরে যাচ্ছে। ছলনাময় অধরা চরিত্র প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে। এভাবে সবার সামনে র্নিলজ্জ ধরা খাবেন তা বিশ্বাস করতে পারছেন না। নিজের ঝানু মাথা আর চাতুর্যপূর্ণ কৌশলের উপর বিশ্বাস ভঙ্গ হয়েছে মনে হচ্ছে। দু’একবার তর্ক করার চেষ্টা করেও প্রমান করতে ব্যার্থ হোন।

টাকার ভাগ সবাই পেয়েছেন। সাখাওয়াত সাহেবও পেয়েছেন।
অবশেষে মৌনতা ভেঙ্গে কথা বললেন অধ্যক্ষ সুখ রঞ্জন দাস।
এই বার ইউএনও বিশ্বাস হারিয়েছেন বলে মনে হলো। তার ধ্যান ধারনা, চিন্তাশক্তি, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার উপর যে আগাত বিশ্বাস ছিল তা সমাধিস্ত হয়েছে বলে মনে হয়। অধ্যক্ষের বোকাবোকা চাহনি, সহজসরল চেহারা, কথা বলতে গিয়ে কথা বলতে না পারার জন্য অধ্যক্ষ সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞানের আলোকে যে ধারনা তা মাঠে মারা গেছে। তিনি যেভাবে মুখ করে বসেছিলেন সেই ভাবেই মুখ পাথরের মতো করেই বসে রইলেন। হঠাৎ মাথা চক্কর দিয়ে উঠলে মানুষ যেমন কিছু সময় ঝিম ধরে বসেন স্বাভাবিক হওয়ার জন্য ইউএনও এর অবস্থাও হয়েছে তেমনি। তার ধারনা ও বাস্তবতার মধ্যে সংযোগ প্রতিষ্ঠায় ব্যার্থ হয়ে কথা বলার শক্তি হারিয়েছেন মনে হয়।
এর মধ্যে সাখাওয়াত সাহেব সরাসরি অস্বীকার করে বলেন ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। অধ্যক্ষ বারবার বলেন সাখাওয়াত হোসেনকে দিয়েছেন। কিন্তু সাখাওয়াত হোসেন কোন ভাবেই স্বীকার করেন না। রাত তখন ৮টা। ইউএনও রাত হয়ে গেছে জানিয়ে সভা মুলতবি করে পরেরদিন বসার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সভা শেষ হলে সাখাওয়াত হোসেন প্রথমে ইউএনও এর কক্ষ থেকে বের হওয়ার জন্য উঠতেই অধ্যক্ষ সুখ রঞ্জন দাস প্রায় লাফ দিয়ে দরজায় গিয়ে দাঁড়ান। তিনি সাখাওয়াত সাহেবের পথ আটকিয়ে বলেন ‘ উপরওয়ালা ও সন্তানের দিব্যি দিয়ে সত্যি করে বলেনতো আমি আপনাকে ৩০ হাজার টাকা দেই নাই।’ ইউএনও টেবিলের উপর কুনই রেখে কপালে হাত দিয়ে দৃষ্টি নিচের দিকে দিয়ে দিলেন। মনে হলো তিনি দ্বিতীয়বার নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়েছেন।


আজ শেষ কর্মদিবসে ৩৩ বছরের চাকুরী জীবনের ইতি টানতে যাচ্ছেন অধ্যক্ষ সুখ রঞ্জন দাস। কিছুক্ষণ পরপর তার কক্ষ থেকে বেরি আসছেন কাকে জেন খোঁজছেন এমন একটি ব্যস্ততা দেখিয়ে। অফিস বিল্ডিং এর কলাপসিবল গেইটে এসে দাড়ান। পুরো ক্যাম্পাসের দিকে তাকান। চশমাটা খুলে একবার মুছেন। আবার চশমা পড়ে ক্যাম্পাসের ডানে বায়ে তাকিয়ে দেখেন। তিনি হয়তো সেই ৩৩ বছরর আগের তার শুরুর সময়টা দেখছেন। খুঁজছেন যৌবনের সেই সোনালী দিনগুলো। ইটের ওয়াল আর টিন শেডের এল আকৃতির কলেজ ভবন। অপর অংশে তর্জার বেড়ার আরেকটি এক চালা ঘর নিয়ে ছিল কলেজ। অধ্যক্ষ বারবার বেরিয়ে এসে শিক্ষক মিলনায়তনের সামনে অফিস বিল্ডিং এর কলাপসিবল গেইটে এসে দাঁড়ালেও শিক্ষকদের সুবিশেষ নজরে তিনি আসছেন না। শিক্ষকরা তাদের মতোই আছেন। বরং তাদের তেতো আলাপ-আলোচনা ও হাসাহাসির কিছু অংশ তিনি যেখানে দাড়িয়ে আছেন সেখানে যাওয়ার কথা। বিশেষ করে নাইম উদ্দিন এর উচ্চ কন্ঠে সমালোচনা এক আধ টুকরো কানে বিঁধেছে বৈকি। কলেজ সরকারিকরণের প্রক্রিয়ায় যে কলেজ সরকারের কোষাগারে প্রায় ১ কোটি টাকা দিয়েছে। সেই কলেজ আজ বেতন দিতে না পেরে দেউলিয়া হয়েছে। এর জন্য অধ্যক্ষ ও সহকারীকে জবাব দিতে হবে। নাইম উদ্দিন স্যার যখন এ কথা বলছিলেন তখন শিক্ষক মিলনায়তনের সামনেই ছিলেন অধ্যক্ষ।
ইউএনও এর জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে তিনি আসলেই দায়িত্ব হস্তান্তর হবে। বসে আর কতক্ষণ গল্প করা যায়।রুম থেকে বেরিয়ে শিক্ষকদের কেউ কেউ অফিস বিল্ডিং এর সামনে হাটাহাটি করছেন। কেউ গল্পগুজব। তার সাথে ইতিহাসের স্বাক্ষী হিসেবে তুলছেন ছবি। সবাই এক সাথে আবার কখনো বিভিন্ন গ্রুপে। কিন্তু একজনও অধ্যক্ষর সাথে ছবি তোলার বিষয়টি মুখে আনেননি। বেলা ১টার পর খবর পাওয়া গেলো ইউএনও আসতে পারছেন না। এসএসসি পরীক্ষার হল পরিদর্শনে থাকায় তিনি অফিসে বসতে পারেননি। এখন নিজ কার্যালয়ে গেছেন এবং বের হওয়ার কোন জো নেই। আড়াইটারদিকে ইউএনও ছাড়াই অধ্যক্ষের দায়িত্ব হস্তান্তর সম্পন্ন করতে সকল শিক্ষক অধ্যক্ষের রুমে অবস্থান নিয়েছেন। অধ্যক্ষের টেবিলে ফাইলের স্তুপ। তার শান্ত সৌম্য মুখমন্ডলে বেদনাতুর গাম্ভীর্য। কিছু সময় পর পর শিক্ষকদের দিকে তাকাচ্ছেন। যদিও শিক্ষকদের মধ্যে কোন অনুভ‚তির প্রকাশ তিনি পাচ্ছেন না। তারা দ্রুত শেষ করে চলে যেতে চাচ্ছেন। তার এ বিদায় তাদের নিকট কোন গুরুত্ব বহন করছে বলে মনে হচ্ছে না। তিনি হয়তো অপেক্ষা করছিলেন কেউ হয়তো দাঁড়িয়ে কিছু বলবেন এবং অন্যদেও কিছু বলার সুযোগ করেদিবেন। পরে তিনি কিছু বলে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। কিন্তু সেই ধরণের কোন লক্ষণ না দেখে তিনি নিজেই বললেন কাজ শুরু করা যাক। সবগুলো ফাইল বুঝিয়ে দিতে সন্ধ্যা ৭টা হয়ে গেলো। সবশেষে মূল রেজুলেশন খাতা হস্তান্তরের পরে অধ্যক্ষ চেয়ার ছেড়ে দিয়ে আহমেদ করিম স্যারকে সেই চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। সাথে সাথে সব শিক্ষকের মোবাইল ক্যামেরা ঝলসে উঠলো। ক্লিক ক্লিক শব্দে আর ক্যামেরার ফ্লাসে অন্যরকম বর্নিল পরিবেশ তৈরি হলো রুমে। একটু আগেও যারা মূর্তির মতো বসেছিলেন তারা প্রণচঞ্চল জীবন্ত হয়ে উঠলেন। তাদের মোবাইল বের করে ছবি তুলতে ব্যস্ত। সবচেয়ে ব্যস্ত অনুপম চক্রবর্তী ও মসুদ ভূইয়া তারা অধ্যক্ষের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে সাথে সাথে ফেইসবুকে দিয়ে দিলেন ‘নতুন অধ্যক্ষের সাথে’। সুখ রঞ্জন দাস পাশেই একটু সরে দাড়িয়ে ছিলেন কিন্তু কেউই তাকে লক্ষ্য করেননি। তারদিকে কারো যেন ভ্রুক্ষেপ নেই। এক মিনিটের মধ্যেই যেন পৃথিবীর আমূল পরিবর্তন। সব আগ্রহ আর ব্যাকুলতা নতুন অধ্যক্ষকে নিয়ে। নতুন অধ্যক্ষকে অভিনন্দন জানিয়ে শিক্ষকরা একে একে চলে যাচ্ছেন। এশার নামাজের আজান হয়ে গেছে। অধ্যক্ষ সুখ রঞ্জন দাস অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিকট থেকে বিদায় নিচ্ছেন তার অশ্রুসিক্ত চোখ। দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ছেড়ে যেতে মনে ঝড় বইছে নিশ্চয়। এই অনুভূতি ছুয়ে যাওয়ার কথা সকলকে। কিন্তু সেরকম কিছুই হচ্ছে না। অপরপক্ষে অনুভূতিহীন-আবেগশূন্য চাহনি। এমন অবস্থায় বেশি সময় থাকা যায়না। অধ্যক্ষ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অফিসের কর্মচারী কর্মকর্তারা সৌজন্যতা দেখিয়ে শুধু এটুকুই বলছেন আবার আসবেন স্যার। এই সামান্যটুকু বলার মধ্যেও নেই কোন সমবেদনা বা আন্তরিকতার রেশ। অফিস সহায়ক সুলেমান এ কথা বলেই সাথে সাথে নাইট গার্ডকে চেচিয়ে বললো শিক্ষক মিলনায়তনের লাইট ফ্যান বন্ধ করে তালা লাগা।
একটি সিএনজি অটোরিক্রায় তিনি কলেজ থেকে বের হচ্ছিলেন। এশার নামাজ থেকে আসছিলেন কয়েকজন শিক্ষক তাদের দেখে সিএনজি থেকে নামলেন এবং শুধু ইদ্রিস আলী স্যারকে বললেন যাই ইদ্রিস সাহেব। অধ্যক্ষর এই যাই কথাটার মধ্যে এতো আবেগ ছিল যে তা মনের সীমাহীন অতলান্ত থেকে উত্থিত। এটা তার বিদায়ের কষ্ট নয় বরং তার কোন এক চরম দুঃখবোধ থেকে উদ্ভূত। মুখে শুধু যাই বললেও, চোখ যেন অনেক কথা বলতে চায়। তবে আপনাকে একটি কথা বলা হয়নি, ইচ্ছে ছিল অফিসে কোন একসময় সবার সামনে বলবো, কিন্তু সময় দিয়ে আর হয়ে উঠলো না। আপনার বিয়ের ব্যাপারে যে কথা হয়েছিল প্রফেসর আকরাম স্যারের মেয়ের বিষয়ে তারা বিয়েতে সম্মত হয়েছেন। দুএকদিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক ভাবে কথা বলবেন তারা । আর আপনি যে সরিৎ লহরী ছদ্মনামে লেখালেখি করেন তাতো কোন দিন বলেননি। আকরাম স্যার বলেছেন, আপনার বই নাকি বেশ জনপ্রিয়।  আমি চলে যাচ্ছি, তবে দাওয়াত যেন পাই। অধ্যক্ষ সুখ রঞ্জন সিএনজিতে উঠে গেলেন। আমি ইদ্রিস সাহেবকে বললাম কনগ্রেচুলেশন। ইদ্রিস সাহেব স্মিত হেসে দিয়ে ছোট করে বললেন ধন্যবাদ।
পরেরদিন রৌদ্রস্নাত ঝরঝরে একটি দিন। হালকা ঝিরিঝিরি বাতাস গায়ে লাগছে বলে বুঝা যায় না তবে অনুভব করা যায়। গাছের পাতা গুলো সামান্য নড়ে চড়ে উঠে যেন গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে বাতাস খেলা করছে। রোদ এখনো কড়া হয়ে উঠেনি। সকালের নরম মিষ্টি রোদ আর হালকা বাতাসের কোমল স্পর্শ মনের মধ্যেও একটি আনন্দানুভূতির সৃষ্টি করে।
কলেজে যথারীতি ক্লাস শুরু হয়েছে। হঠাৎ শিক্ষকদের মধ্যে চাঞ্চল্য, অনেকের চোখে মুখে উদ্বেগ, শিক্ষক মিলনায়তন ও অধ্যক্ষের রুমে চলছে দৌড়াদৌড়ি। কি হয়েছে সে দিকে যাওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের সাজেশনটা দিয়ে যাই। অধ্যক্ষের রুম থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে কুমকুম খাতুন অধ্যক্ষের রুমের দিকেই যাচ্ছিলেন কালাম স্যারকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বলে উঠলেন ‘ সুখ পাখি সুখ নিয়ে পালিয়েছে । আবুল কালাম জানতে চান কি হয়েছে। তিনি বলেন গিয়ে দেখেন। কুমকুম খাতুন হতবিহব্বল, নিজেদের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছেন না। এইজন্যই গত দুইদিন থেকে ইউএনও এর পেছনে লেগে ছিলেন। কলেজ শেষে ইউএনওর অফিসে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকেছেন। শিক্ষক মিলনায়তনে এসব বলে গজরাতে থাকেন তিনি। ডিগ্রি ২য় বর্ষের সাজেশন দিয়ে অধ্যক্ষের রুমে গিয়ে দেখি উত্তপ্ত পরিবেশ। শিক্ষকরা পরস্পর কথা বলছেন।

যেমন ছিল, তেমনইতো ভালো চলছিলো ? এদেরকে বেতন ভাতা দেয়ার কি দরকার ছিল ? আমাদেরকে বিপদে ফেলে গেলেন। এখন কি করা যায়, ইউএনও এর কাছে গিয়ে এখন বন্ধ করাও যাবে না। সরকারি নিয়ম ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক এটা তাদের প্রাপ্ত। আরো শিক্ষক এসে অধ্যক্ষের রুমে প্রবেশ করছেন। সবার কথা বন্ধ করে দিয়ে নতুন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আহমেদ করিম রুমে একবার সবার দিকে তাকালেন এবং আপন মনে অস্ফুট উচ্চরণ করেন তারা কেউ নেই।
অধ্যক্ষ সুখ রঞ্জন দাস কি করেছেন শুনুন। আপনাদের বিশ্বাস হবে না জানি। আপনাদের এতোদিনের বিশ্বাস ভঙ্গ হবে। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আহমেদ করিমের একথা শুনে পুরো রুমে পিনপতন নিরবতা। শুরু করলেন আহমেদ করিম, গতকাল দায়িত্ব গ্রহণ শেষ হতে রাত হয়ে যাওয়ায় সব কিছু দেখা সম্ভব হয়নি। এখন রেজুলেশন খাতা পড়ে দেখা যাচ্ছে গত পরশু তিনি নতুন একটি রেজুলেশন করেছেন এবং তাতে অনার্স কোর্সের শিক্ষকদের সম্পূর্ণ বেতন ভাতা সরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমোতাবেক প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ইউএনও এর মাধ্যমে অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন। আগামী মাস থেকে তাদের সম্পূর্ণ বেতন ভাতা প্রদান করতে হবে। রেজুলেশেনে পরের প্যারায় বেতনভাতা প্রদানের অঙ্গিকার করার পরও এতোদিন বেতন ভাতাদি প্রদান না করতে পারায় করেছেন দুঃখ প্রকাশ। নিরব নিশ্বব্ধ রুমে দুঃখ প্রকাশ শব্দটি যেন বারবার প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো। বন-বনানী মাঠ পেরিয়ে কোন সুদূর থেকে এসে শব্দটি যেন তীব্র নিনাদে প্রকম্পিত করে পুরো কক্ষ।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here