রসগোল্লা
আলতাকিদ কিসমতি

এক
—–

দুবাই এয়ারপোর্টে বসে আছি দেশে আসার বিমানের অপেক্ষায়। হিথ্রে থেকে যাত্রা করেছি দুবাই থেকে কানেক্টিং ফ্লাইটে বাংলাদেশ। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের যে বিমানে আমরা যাবো সেটিতে কি একটি ত্রুটি দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ ফ্লাইট ডিলে। দুবাই বিশাল এয়ারপোর্ট, সম্ভবত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম। একটি দেশের মতো একটি বিমানবন্দর। বিমানবন্দরের কুল কিনারা করার কোন উপায় নেই। বিশ্বের সবদেশের মানুষ, সাদা, কালো, বাদামী, এশিয়, মঙ্গলীয় তাবদ জাতি-ধর্মের মানুষে গিজগিজ করছে। খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে বিশ্বেরর সব ধরণের পণ্যের বিশাল বাজার বিমানবন্দরের মধ্যে। বিশাল বিশাল লাউন্স আর লবি। শুধু মানুষ গুলো যেন লিলিপুটরে মতো, তুচ্ছ, নঘন্য মনে হয়। মনিষা অনন্যা কে নিয়ে হাঁটা হাটি করছে। মনিষা আমার স্ত্রী ও অনন্যা ৪ বছরের রাজকন্যা। আমি ব্যাঞ্চে বসে কি কি কাজ শেষ করে আসতে পারলাম না সেই হিসেব কসছি এবং ২ বছর পর বাড়ির যাচ্ছি সেখানের অবস্থা মাঝে মাঝে কল্পনায় আসছে। আমার পাশে একজন বেঞ্চে মাথা ফেলে দেদারসে ঘুমাচ্ছেন। এধরণের পথে ঘাটে গাড়িতে ঘুমানো মানুষ দেখলেই আমার মারাত্নক বিরক্ত লাগে। কিন্তু এই লোকটির বেলায় তেমন মনে হচ্ছে না। বরং লোকটির গায়ে একটি চাদর দিতে পারলে ভালো লাগতো। লোকটির সৌম্যদর্শন চেহারা, শিশুর মতো ঘুমাচ্ছেন। উচ্চতায় ৫ ফুট ৮-১০ ইঞ্চি লম্বা হবেন। মধ্যম গড়ন শরীর। মোটাও নয় আবার হেংলাও নন। ফর্সা চেহারা কিন্তু ফেকাশে নয়। নাক টিকালো নয়, তবে চেহারার সাথে মানানসই। তার চেহারার মধ্যে শান্ত একটা আভা ছড়িয়ে দেয়। কাপড়চোপড়ে মনে হচ্ছে খুবই রুচি সম্পন্ন মানুষ। পায়ে ঝকঝকে পলিশ করা কালো রং এর ফরমাল শু। নেভী ব্লু এর উপর হালকা সাদা টান স্কোয়ারের সৃষ্টি করেছে। ভালো করে তাকালে বুঝা যায় দূর থেকে দেখলে হয়তো নেভী ব্লু কোট পেন্ট মনে হবে। নেভী ব্লু এর সাথে ম্যাচ করা ওফহোয়াইট কালার শার্ট। উন্নত পিন বোতাম কোর্টের হাতে। একজন পরিপূর্ণ জেন্টেলম্যান হিসেবেই গ্রহণ করা যায়। ঘুমানোর সময় তার মাথা কখনো কখনো ঢলে পাশের একজন নারীর কাঁধে পড়ছে। দুই আড়াই বছরের শিশু কোলে সেই নারী বিরক্ত হচ্ছেন বলে মনে হয় না। এতে অনুমান করা যায় সম্ভবত সেই লোকের সহধর্মীনি হবেন। তবে লোকটি যেখানে গৌরবর্ণ, মহিলাটির গায়ের রং উজ্জল শ্যামলা। উচ্চতা সাধারণ। অমাদের দেশের গড়পড়তা মেয়েরা যেমন হয় তেমনি। তবে তার শিল্প সুষমামন্ডিত নান্দনিক সৌকার্যে সমৃদ্ধ নাক, ঠোট, মুখের ডোল এবং তার উপর বড় বড় একজোড়া চোখ তাকে অনন্য রুপ দিয়েছে। তাকে একজন ব্যক্তিত্বসম্পূর্ণ মহিলা হিসেবেই মনে হচ্ছে। স্বামীর ঘুমানের সুবিধা করে দিতেই একদিকে তিনি বসে আছেন বুঝা যায়। কখনো যদি ঘুমের ঘোরে স্বামীর মাথা সেদিকে ঢলে পড়ে তাতে যেন ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে।

তোমার মাথায় কোন কিছুই থাকে না।

কি করলাম আবার।

বাবার জন্য যেসব জিনসপত্র কিনেছিলাম সেসব লাগেজে নেয়া হয়নি।

আমি মনে রাখবো কিভাবে। বাইরে থেকে এসে আর সময় পেলাম কৈ। নিজেওতো মনে রাখতে পারো।

আমি মনে না রাখলে পরিবারটি সামলাচ্ছে কে শুনি। দুএকটি কাজ করতে বললে তাতেও হাত ভেঙ্গে পড়ে।

আসলে গতকালকে মনটা ঠিক ছিল না।

তা মনটা বিগড়ে ছিল কেন জানতে পারি। পুরনো কাসুন্দি বাজার, অফিস, কলিগের সাথে ঝামেলা আর শুনিও না, নতুন কোন এসকিউস থাকলে শুনি।

যে ভয়ে ছিলাম তাই ঘটলো। আমাদের অপলাপে পাশে ঘুমিয়ে থাকা ভদ্রলোক জেগে উঠলেন এবং মাথা একপাশে ফেলে রাখা অবস্থায় একচোখ হালকা মেলে আমাদের দিকে একবার তাকালেন।

বসতে বসতে আর ভালো লাগছিল না, ক্যাফেতে গেলাম কিছু খেতে। সেই লোকও কিছুক্ষণ পর সেখানে হাজির। টেবিল খালি নেই তারাও আমাদের টেবিলে বসলো। লোকটির চেহারার মধ্যে সহনাভূতি উদ্রেককারী একটা ভাব আছে। কালো ভুরুর নিচে গভীর শান্ত চোখ। হাত বের করে এগিয়ে দিয়ে বললাম রাসেল। হেডশেক করে হাস্যজ্জ্বল মুখে জবাব দিলেন এহসান, এহসান চৌধুরী। আমার স্ত্রীর সাথে পরিচয় হলো। যা অনুমান করেছিলা ঠিক হয়েছে লোকটির সাথে তার সহধর্মীনি শাম্মী। অল্পক্ষণের মধ্যে কথা জমে উঠলো। মনিষার সাথেও শাম্মীর বেশ অন্তরঙ্গ আলাপ শুরু হলো। আমিতো হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক এয়ারপোর্টের সময়টুকু মনিষা একজন গল্পকরার মানুষ পেয়েছে এবং আমিও।

ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির কিংস কলেজে ওয়েলফেয়ার ইকোনমিকস-এ এমফিল করছেন এহসান। তার স্ত্রী শাম্মীও একই ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। আমি চিকিৎসক এবং লন্ডনের একটি হাসপাতালে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছি এবং মনিষা একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন জেনে খুব ইমপ্রেস হলেন এহসান।
বুঝলেন, দুই দিন থেকে ঘুম নেই। মেয়েটার শরীর খারাপ ছিল, ইউনির্ভাসিটি-মেয়ে সামলাতে গিয়ে একটুকুও ঘুম হয়নি। আজ ইউনির্ভাসিটি থেকে এসে সরাসরি এয়ারপোর্ট। নিজের ঘুমানের কইফিওত দিলেন এহসান। আমি উঠছি বুঝতে পেরে শাম্মী এহসানের দিকে বড় বড় চোখ গুলো আরো বড় করে তাকিয়ে কি যেন ইশারা করলেন সাথে সাথে এহসান উঠে গিয়ে ক্যাফের বিল পরিশোধ করে দেয়। তাদের এই বুঝাপড়া দেখে ভালো লাগলো, আনন্দও হয়।
আমরা দুজন একটু হেঁটে আসছি বলে এহসানকে নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। কথা প্রসঙ্গে তিনি যখন বললেন যে তার বাড়ি সিলেটে তবে জন্ম চট্টগ্রাম আমি বিষ্ময়ে বিমূঢ়। বিষ্ময়আভিভূত হয়ে তার দিকে চেয়ে থাকলাম। আমার দৃষ্টি স্থির, হাঁটা বন্ধ। আমি প্রথম থেকেই অনুমান করছিলাম এই চেহারা আমার পরিচিত হবে। আমি আবেগআপ্লুত হয়ে অধৈর্য হয়ে ব্যাকুল কন্ঠে বললাম তুই রাজন না ? সেও সমান বিষ্মিত হয়ে জিজ্ঞাস করলো তুই। আমি বললাম চিন্তা করে বল আমি কে। একমূহূর্ত চিন্তা করে তুই ক্লাসের ফাস্ট বয় রাসেল, ঠিক বলিনি বলে সে বলে উঠলো ও মাই গড। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলাম। প্রায় ২০ বছর পর দেখা। তোর চেহারা, উচ্চতা এবং দাঁতের কালো একটি দাগ দেখেই আমার মনে হচ্ছিলো তুই রাজন। কিন্তু যখন বললি তোরা চট্টগ্রাম ছিল তখন আর সন্দেহ রইলো না। আমার অধরের নিচের তিল এবং গোল মুখ দেখে রাজন আমাকে চিনেছে বলে জানায়। রাজন এহসানের ডাক নাম। দুজনেই একই কলোনীতে পাশাপশি বিল্ডিং এ ছিলাম একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়তাম। রাজনের আব্বা অবসরে গেলে তারা বাড়ি চলে আসে। তখন হয়তো আমরা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। এরপর আজ এতোদিন পরে দেখা। দুই জন একবার হাসি আবার তাকিয়ে থাকি, আবার হাসি আবার দেখি। মনিষা আর শাম্মী দূর থেকে আমাদের কৌতুহলি চোখে বিষ্ফোরিত নেত্রে দেখছে। আমাদের স্কুল জীবনের দূরন্তপনার ইচ্ছা আবার যেন মাথায় চেপে বসেছে। এহসানকে নিয়ে এটা খাই ওটা খাই। একটা শেষ না হতেই এহসান আরো তিনটা কিনে নেয়। আইক্রিম খাওয়া শেষ হতে না হতেই বার্গার, বার্গার শেষ না হতেই রোল, রোল শেষ না হতেই চকলেট। কেউ কেউ হয়তো আমাদের দেখে আশ্চার্য হচ্ছেন বৈকি। স্কুল জীবনে আমাদের একটি নেশা ছিল বাজারের সবগুলো নতুন হোটেলে আমাদের একবার খেতে হবে। তখনকার দিনে ছোটদের হোটেলে বসা বেশ সাহসের ব্যাপার ছিল। সেই ইতিহাস জেগে উঠলো, না আমরা সেই শৈশবে ফিরে গেলাম বুঝতে পারছি না। এয়ারপোর্টের প্রতিটি দোকানে টু মারাছি। একটি কেক পেস্টির দোকানে ঢুকেছি। দুটি স্পেশাল কফি ওর্ডার দিলো রাজন। আমি দিলাম মিষ্টি। তারা আমাদের মুখের দিকে একটু তাকিয়ে ওর্ডার রিসিভ করলো। কফির সাথে মিষ্টি। তাদের মাথায় ঢুকছে না। আর ঢুকবেই বা কেমনে আমাদের তো সত্যিই মাথা খারাপ। কফি খেতে খেতে রাজ্যের গল্প। কি বলবো, কি না। একটাও পুরোপুরি বলাতে পারি না। নতুন গল্প চলে আসে। কফি যখন খাচ্ছি তখন মিষ্টি এনে রাখলো সামনে। রাজন মিষ্টির দিকে তাকিয়ে হা হা করে হেসে উঠলো। সবাই আমাদের দিকে তাকি। আমিও উঠলাম হা হা করে। আমাদের এখন মাথায় কিছু নাই সুতরাং যার যা ইচ্ছা মনে করতে পারেন। কফি খাওয়ার মধ্যেই চললো মিষ্টি খাওয়া। এক চুমুক কফি আর একটুকরো মিষ্টি। সবাই আমাদের খেয়াল করছে দেখে আমরা দুজনে ইচ্ছে করে ফিশফিশ করি পরক্ষণে হেসে উঠি। দোকানদার হয়তো পুলিশ ডাকবে মনে হচ্ছে। অন্ততো তার মুখের অবস্থা দেখলে তাই মনে হয়। আর বাড়লাম না। আমরা কফির মগ নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। হাঁটতে হাঁটতে বললাম বন্ধু মিষ্টি খাওয়ার সময় হাসি টা অসাধারণ হয়েছে, সবাই বোকার মত হা করে তাকিয়েছিল। একথা বলতেই আবারো হা হা করে একচোট হাসি।

দুই
—–

কিছুক্ষণ থেমে রাজন বললো মিষ্টি মানে রসগোল্লা নিয়ে এক বিরাট ইতিহাস। শুনলে তোরও হাসি পাবে।

তাহলেতো বল। আজকে হাসতে হাসতে শহীদ হবো। ইয়া মাবুদে ইলাহী বিমানের ফ্লাইটা আরো দেরি করে দাও। এখন আমাদের বিমানে তুললে বিমানেরও ক্ষতি হতে পারে।

রাইট। আমাদের মাথা ঠিক নেই। ভালো চায়তো দেরি করুক।

এখন রসগোল্লার রহস্য উন্মোচনে আমরা ব্যস্ত আছি। তাড়াতাড়ি বলে ফেল আরো অনেক গল্প অপেক্ষা করছে।

রসগোল্পার গল্প পুরোটা না শুনতে বুঝবি না, আজ থাক পরে শুনবি।

না রসগোল্লা শেষ না করলে, অন্য গুলো জমবে না।

একটু থেমে শোন, ৪ বছর পূর্বে তখন আমি গোলাপগঞ্জ উপজেলার নবদ্বীপ ডিগ্রি কলেজে শিক্ষকতায় যোগদান করেছি। স্থানীয় জজগেইট বাজার আমার বিচরণ ক্ষেত্র। শুধু আমারই নয়, আমাদের কলেজের সবাই কলেজ শেষ একবার বাজারে চা পরাটা খেয়ে যাবেনই। না হলে দিনের যেন কোন একটি কাজ বাকি থেকে যায়। পুরোদিনের কাজের পূর্ণতা পায় না। তবে আমি তাদের থেকে একটু ব্যতিক্রম। আমার এক প্রিয়বন্ধু জাহেদের বাড়ি সেই এলাকায়। তাই আমি প্রায় সময়ই কলেজ শেষেও বাজারে ঘুরাঘুরি করি। জজগেইট বাজারে প্রায় সব গলি ঘুপচি আমার চেনা। এই ঘুরাঘুরির কারণে মানুষের সাথেও আমার একটি পরিচয় হয়ে যায়। জাহেদ আর আমি কোন কোন দিন উদ্দেশ্যেহীন বেরিয়ে পড়ি। কখনো কোন নদীর ধারে, বা কোন গ্রামে অথবা কোন দোকানে বসে প্রতিযোগিতা করে খাওয়া দাওয়া।
আমাদের এসব কর্মকান্ড যারা সামনে থেকে দেখেন তারা আজকের মতই আমাদের নিয়ে চিন্তায় পড়ে যেতেন। দোকানদাররা ভাবনায় পড়ে যেতো শেষ পর্যন্ত টাল দুইটা বিল দিব কি না!
জজগেইট বাজারের একটি বেশ পুরোনো এবং বিখ্যাত মিষ্টির দোকান নিমাই মিষ্টিঘর। পুরোন টিনশেডের একটি ঘর। অন্ধকার ঝুপড়ি ঘরের মতো। সামনে বসার জন্য দুটি ছোট টেবিল এবং ৫/৬টি চেয়ার আছে আর পিছনে তাদের মিষ্টি তৈরির কারখানা। তাদের পরিচিতি সর্বজনবিদিত। সাদা ও কালো এই দুই ধরনের রসগোল্ল্ইা শুধু তারা তৈরি করে এবং তাদের মিষ্টি সত্যিই অসাধারণ। মুখে দিলেই মিলিয়ে যায়। একবারে বসেই ৭/৮টা রসগোল্লা অনায়াসে খাওয়া যায়। এলাকায় প্রচলিত আছে অনেকে রোগের মুক্তির পথ্য মনে করেও নামি নিমাই এর রসগোল্লা খেয়ে থাকেন। যেহেতু বাজারে চক্কর দেই স্থানীয় রাজনীতিবিদ, সামাজসেবক, বিশিষ্ট এবং অবিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে আমার পরিচয় ছিল। প্রতিদিন সকালে কলেজে আসি। দুপুরে বের হই এবং রাত পর্যন্ত ঘুরাঘুরি করে বাসায় যাই ১০ কি ১১টারদিকে। ভালোই আনন্দের সাথেই কাটছিল দিন কাল। কলেজ থেকে বরং আমার এই ঘুরাঘুরিতে যত আনন্দ। সেদিন কলেজ ছিল বন্ধ। দিনটি ছিল পরিষ্কার ঝকঝকে। নীল আকাশে শুভ্র মেঘের আনাগোনা। বেশ গরম হলেও খারাপ লাগে না। বরং আনন্দই লাগছে। জাহেদ ফোন দিলো চলে আয়। সুন্দর নির্মল বাতাস, মাঝে মাঝে হালকা ঝাপটা দিচ্ছে। দুপুরে খেয়েদেয়ে বের হয়ে গেলাম। গল্পগুজব ঘোরাঘুরি করছি। বিকেলে হঠাৎ জাহেদ বলে চল নিমাই এর রসগোল্লা খাবো। যেই বলা সেই কাজ। সাথে সাথে তার মোটরসাইকেল স্টার্ট। নিমাই এর ঘরে রসগোল্লা কতটুকু খেলাম মনে নেই। জাহেদ বললো আরো এক কেজি রসগোল্লা কিনে নে। আমি আরো এক কেজি পেকেট করে দিতে বললাম। তাকে অবশ্য একবার জিজ্ঞেস করলাম কি করবি।

সে শুধু বললো দরকার আছে। পরিচিত যাকে পাবো তাকেই খাওয়াবো।

খারাপ না বাজারে ব্যাস্ত রাস্তায় একজনকে দাঁড় করিয়ে একটি রসগোল্লা মুখে তুলে দিলে তার অবস্থা হবে সারর্কাসের বস্তুর মতো। একজন হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে খুব দ্রুত হাটছেন। তাকে রাস্তার মধ্যে হঠাৎ থামিয়ে দিলাম। একটু সাইডে আসেন, ব্যাগটা রাখেন। তারপর রসগোল্লার প্যাকেটটা খুলে, দেখি মুখটা হা করুন। বাজার ভর্তি মানুষের সামনে, চারদিকে মানুষ চেয়ে আছে তার মধ্যে রসগোল্লা মুখে দিতল তার কি যে অবস্থা হবে ভাবতেই আনন্দ লাগছিল।
ভাবছিলাম খালিক মাতালের কথা। তাকে পেয়ে গেলে ভালো মজা হবে। তাকে একটি রসগোল্লা খাইয়ে ইচ্ছে মতো যে কারো বিরুদ্ধে বকানো যাবে। একবার দুপুরের খাবার খাইয়ে বলেছিলাম সাবরেজিস্ট্রুারি অফিসের এনামুল হক এর ব্যাপারে কিছু বক্তব্য রাখতে। সাবরেজিস্ট্রারি অফিসে চাকুরী করে ঘুষে হুশে বহু পয়সা কামিয়েছেন এনামুল হক। বিকেলে আমি আর জাহিদ বাজারের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি জারুল তলায় দাঁড়িয়ে খালিক তখনও বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। দুই হাত উপরে নিচে দুলিয়ে জনসভার বক্তব্যের ভঙ্গিতে বিশাল কন্ঠে বলে যাচ্ছে ‘ দুর্নীতিবাজরা দেশ ও জাতির শক্রু। উন্নয়নের প্রতিবন্ধক। যেকোন মূল্যে তাদের প্রতিহত করতে হবে। সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। এনামুল হকের টাকার হিসেব জনগণ জানতে চায়। কয়েকজন তাকে ঘিরে আছেন, অনেকে দূর থেকে ঠিক আছে; চলুক, চলুক বলে তাকে আরো উস্কে দিচ্ছেন। একজন তাকে কি যেন দিতে চাইছিল কিন্তু তার সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। অবস্থা বেগতিক দেখে আমারা অন্য একজনকে পাঠিয়ে খালিক মাতালকে একটু দুরে সরিয়ে এনে আদর করে পাশে বসই।

ঐ লোকটি কি দিতে চায়।

এনামুল হক পাঠিয়েছেন, টাকা দিতে চেয়েছিল, নেই নাই।

গুড, বাপের বেটা।

দেখলাম পরবর্তি খাওয়ার কোন ব্যবস্থা করে না দিলে সে থামবে না। তাকে আবারো হোটেলে খাইয়ে বাড়ির রাস্তা ধরিয়ে দেই।

তিন
——-

নিমাই এর ঘর থেকে বের হতে না হতেই চিৎকার সরগোল। বাজারে চারদিকে দৌড়াদৌড়ি। দুই গ্রামের লোকদের মধ্যে মারামারি ১০ মিনিটে বাজার ফাঁকা। সন্ধ্যা হয়ে গেছে মিষ্টি খাওয়ানোর মতো কাউকে পাওয়া গেলো না। কি করা যায়।

জাহেদ বললো জুনই ডাক্তারের দোকানে দিয়ে দেই।

জুনই ডাক্তার এলাকার খুবই পরিচিত মুখ। সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী এবং সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। তিনি আবার আমার কলেজের গভর্নিং বডির সাবেক সদস্য এবং এলাকার একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সাথে জড়িত। তার ‘আরোগ্য ঔষধালয়’ এলাকার প্রতিটি মানুষের আশ্রয় স্থল। এলাকার যেকোন সমস্যায় মানুষ তার নিকট আসেন এবং এই ডিসপেন্সসারী তার শুধু চিকিৎসা কেন্দ্র নয়, এলাকার সকল সমস্যার সামাধান কেন্দ্র।
যেহেতু কাউকে পাওয়া গেলো না সেহেতু তার ওখানে দিয়ে যাই। দিনরাত চেম্বারে মানুষ লেগে থাকে তাদের খাওয়াবেন। গিয়ে দেখি তিনি ডিসপেন্সারীতে নেই। কর্মচারী জানালো বাজারে মারামারির ঘটনায় সালিশ বিচারে গিয়েছেন। কি আর করা রসগোল্লার প্যাকেটটি দিয়ে বললাম ডাক্তার সাহেবকে দিবে। অবশ্য আমাদের নিয়ত পুরা করতে আমাদের সামনেই তাকে একটি খাইয়ে দিলাম। কলেজের শিক্ষকরা প্রায়ই ডাক্তারের চেম্বারে আসেন এবং কলেজ ও এলাকার বিষয় আসয় নিয়ে আলোচনা করেন। আমরা চলে যাওয়ার ঘন্টা খানেক পর আমার কলেজের ইদ্রিস স্যারসহ ৩ জন শিক্ষক ডাক্তারের চেম্বারের এসেছিলেন দেখা করতে ডাক্তারকে না পেয়ে তারা চলে যাচ্ছেন এমন সময় দেখেন রসগোল্লার প্যাকেট। দোকানের কর্মচারীকে কি ব্যাপার রসগোল্লা কেন জিজ্ঞাস করলে সে জানায় এহসান স্যার দিয়ে গেছেন, কেন জানি না, কিছু বলেন নাই। কর্মচারীর এই ভাষ্য শুনে ইদ্রিস স্যারসহ বাকি ২জনের তো হৃদপিন্ড লাফ দিয়ে উঠেছে। তাহলে কলেজ সরকারিকরণের গেজেট হয়ে গেছে নিশ্চিত! এহসান সাহেব যেহেতু লেখালেখি করেন এবং মন্ত্রানালয়ে তার যোগাযোগ আছে তাই তিনি হয়তো আগে খবর পেয়েছেন। ইদ্রিস স্যার আমাকে ফোন করছেন আমার মোবাইল বন্ধ। অবশ্য জজগেইট বাজারে আসার পর থেকে আমার মোবইলে চার্চ নেই বন্ধ হয়ে আছে। বারবার আমাকে না পেয়ে তারা অন্য শিক্ষকদের ফোন দেয়া শুরু করলেন। খুশিতে সাবাইকে ফোন করে জানিয়ে দিতে থাকেন এহসান স্যার মিষ্টি দিয়ে গেছেন ডাক্তারের চেম্বারে, কালকে হয়তো কলেজে নিয়ে আসবেন। সবাই আমার মোবাইলে যোগাযোগ করছেন কিন্ত পাচ্ছেন না। অনেকে বাড়িতে পরিবার বা আত্নীয় স্বজনদেরও সেই সুখবর পৌছে দিলেন। শুধু আমাদের কলেজ না, কথায় কথায় সেই কথা অন্যসব কলেজেও ছড়িয়ে পড়লো। আরো ঘন্টা খানে পরে ডাক্তার আসলেন ডিসপেন্সারীতে। তিনি মিষ্টির কার্টোন দেখে জিজ্ঞাস করলেন কি ব্যাপার। কর্মচারী জানালো এহসান স্যার দিয়ে গেছেন। তিনিও আমাকে ফোন দিলেন কিন্তু মোবাইল বন্ধ। এর মধ্যে দোকানে একজনের পর অন্যজন আসেন। ডাক্তার তাদের মিষ্টি দিচ্ছেন তারা কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এহসান স্যার দিয়ে গেছেন, সম্ভবত তার বিয়ে ঠিক হয়েছেন, তাই। এই সংবাদটিও ভালো ভাবেই রাষ্ট্র হলো। যেহেতু অনেকের সাথে আমার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। তাই আমি বিয়ে করছি শুনে তারা বাজারে পরিচিত একজন অপরজনকে পৌছে দিয়েছেন এবং অনেকে মনক্ষুন্ন হয়েছেন তাদের না জানানোয়। আমি বিভিন্ন জায়গায় টুমেরে রাত ১১টারদিকে বাসায় গিয়েছি। বাসায় গিয়ে খাতা দেখতে বসে পড়লাম। পরদিন সকাল ৮টারদিকে কি কাজে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি বন্ধ। মনে পড়লো গতকাল বিকেল থেকেই মোবাইলে চার্চ নেই। দ্রুত চার্জে লাগিয়েছি। মোবাইলটি ওপেনিং রিং বাজিয়ে যেই মাত্র জীবন্ত হয়ে উঠেছে মাত্র, অমনি ফোন বেজে উঠলো। রিসিফ করতেই

একটি মোলায়েম, পেলব কচি নারী কণ্ঠ
ভাঙ্গাভাঙ্গা গলায়, কিছুটা কান্না জড়িতের মতো অস্ফুট কন্ঠে
কোন ধরণের সম্বোধন না করে সোজা প্রশ্ন
স্যার আপনি বলে বিয়ে করছেন ?
আমি অগ্রপশ্চাত না ভেবে সরাসরি বলাল না, কে বলেছে ?
সে আর কোন কথাই বলল না লাইন কেটে দিল। এরপর থেকেই যে ফোন আসতে শুরু হলো মোবাইল আর রাখার কোন জো নেই। কলেজ সরকারিকরণের গেজেট হয়েছে আপনি আমাদের না জানিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে মিষ্টি দিচ্ছেন। আপনি ভারী অন্যায্য মানুষ। কি বলি তাদের। মিষ্টি এমনিতেই কোন কারণ ছাড়া দিয়েছি বললেও তারা পাগল বলবে। বললাম আমাকে অন্য একজন মিষ্টি দিয়েছিল আমি খাবো না তাই সেখানে দিয়েছিলাম। ডাক্তারের ডিসপেনসারীতে যেহেতু অনেক মানুষ আসেন তাই সেখানে রেখে আসি। শিক্ষকরা এতোই হতাশ হলেন যে তারা কথা বলা পর্যন্ত বন্ধ করে দিলেন। এলাকার বিভিন্ন শ্রেনি পেশার মানুষ ফোন দিচ্ছেন ‘বিয়ে করছেন আমাদেরতো একবার জানে পারতেন, আমরাতো আর আপনার বৌ নিয়ে পালাবো না। বিয়েতে কিছু দিতে না পারি অন্তত প্রাণখুলে আর্শিবাদতো করতে পারবো। জবাব দেয়ার কোন ভাষা নেই। যত বলি না, ততই তারা বলে আর লুকাতে হবে না।

চার
——
শিক্ষক ও এলাকাবাসীর ফোনও নানামুখী প্রশ্নে আমার মাথা একে বারে গুলিয়ে গেল। যথারীতি আবারো কলেজ, বাজার আর ঘুরাঘুরির মধ্যে দিন যাচ্ছে। তবে মনের মধ্যে একটি প্রশ্ন বারবার উকি মারতে শুরু করে শিক্ষক ও এলাকাবাসীকে চিনলাম কিন্তু যে মেয়েটি ফোন করলো সে কে ?
আমার মধ্যে একধরণের চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগলো। এই প্রথম আমার সাথে এধরণের ঘটনা ঘটলো। কে সে, কেমন সে। কেনইবা ফোন করলো। কোল লোভ বা লালসা থেকে নয়,বরং মানুষটা কে জানার জন্য। শুধু একবার দেখা অথবা তার সাথে কথা বলা এই যা। মানুষটা কি আমার পরিচিত না অজ্ঞাত কেউ। একটি রহস্যের কিনারা করা আর-কি।
তুই জানিস কি-না জানিনা, আমি সবসময় একটু সেক্রিফাইজিং বা ছাড় দেওয়ার মানসিকতার মানুষ। আমার যদি সমস্যা না হয় বা আমি যদি কোন রকমে চলতে পারি তবেই আমি খুশি। অন্যরা ভালো থাকুক, ভালো করুক, ভালো চলুক এমন একটি চিন্তা সব সময় থাকে। নিজে কোন রকমে চালিয়ে যাওয়ার কারণে যদি অন্যজন সুযোগ পায় তাতেই খুশি হই। এই চরিত্রকে মাঝে মাঝে ভীরুতা বা অযোগ্যতাই মনে হয়।
বুঝলি, এই মানসিকতা হয়তো পরিবার থেকে আসছে। আমার মা হচ্ছেন চরম ছাড় দেওয়ার মানুষ। নিজের কোন রকমে চললেই হলো। বাকিটা অন্যের জন্য রেখে দিতেন। ভিক্ষুক বা বাড়ির কাজের লোক তার বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করতো। প্রায় সময় যে ভিক্ষুকরা আসে তারা এসেই মা জননীকে খোঁজে। কাজের লোক বলেন বা এলাকার কোন অসহায় মানুষ এসেই মা জননী বা বড় মা (এলাকার অনেকে আমার মাকে বড় মা ডাকেন) কে খোঁজ করবে। তাকে পেলে কোন কারণ বা অসুবিধা দেখিয়ে কিছু অতিরিক্ত নিতে পারবে। মা তার নিজের জন্য আছে কি-না দেখবেন না। আমরা বাবা তাই আমার মাকে ডাকেন পিরানী।
এই চরিত্রের কারণে আমাকে অনেকে বলেন আমি সহজে মানুষকে বিশ্বাস করি এবং শুধুশুধু ছাড় দেই। এটা অবশ্য ঠিক ঝাঁপিয়ে পড়ার মধ্যে যে আক্রমনাত্নক বা প্রচন্ড ক্রুদ্ধতা আমরা নেই। মানুষকে আক্রমন করে দুমড়ে মুচড়ে স্বার্থ উদ্ধার করা আমরা হয় না। সেজন্য আমি সুপারিশ করে কোথাও কাজ উদ্ধার বা সুবিধা পাই না। সুপারিশের সাথে যে আক্রমনাত্নক ভাব ও বাচনভঙ্গি প্রয়োজন তা আমার নেই। কারো কাছে কোন কিছু চাইতে যেমন সংকোচ লাগে। যদি কোন কিছু করে দেয় আরো বেশি লজ্জা লাগে এবং কৃতজ্ঞতা বোধের সীমা ছাড়িয়ে যায়। আবার নিজে যখন বুঝতে পারি আমার অনুরোধটি রাখার সম্পূর্ণ সুযোগ আছে এবং কোন সমস্যা নেই তারপরও অনুরোধটি রাখা হচ্ছে না। তারপরও বলতে পারি না। সুতরাং ফোন যিনি করেছেন তার ব্যাপারে আমার কৌতুহল আছে, কিন্তু সিরিয়াস চিন্তা ভাবনা আমার নেই। তা বুঝতেই পারছিস।

পাঁচ
—-

এ ঘটনার মাস দুয়েক পরে ঘর থেকে বিয়ের জন্য চাপ আসতে শুরু করলো। আমি কাতকুত হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি। ধরা দেই না। আমার মনে মনে শুধু সেই মেয়েটিকে খুঁজছি। তাকে শুধু একবার দেখলেই বা জানলেই হলো। ঘর থেকে বলা হলো আমার মামা চিকিৎসক, ইংল্যান্ড তাকেন, তার এক বন্ধুর বোনের মেয়ে ইউনিভার্সিটিতে ৩য় বর্ষে পড়ে। গায়ের রং তেমন নয়, তবে গঠন-গড়ন চমৎকার, মায়াবী। মেয়েটি রুপসী নয় তবে লক্ষী। ঘর থেকে হয়তো মনে করছেন মেয়েটির রং ফর্সা না হওয়ায় হয়তো আমি পিছু হটছি। কিন্তু আমি ছাড় দেয়ার মানসিকতার মানুষ তাই এ ব্যাপারে আমার কোন পছন্দ নেই। কিন্তু সেই ফোনের মোলায়েম কন্ঠের তটিনিটি কে? অন্তত একটি মানুষ যে আমাকে নিয়ে ভেবেছে। তাকে ভাবনায় রেখে আমি কিভাবে অন্যের সাথে চলে যাবো। তার মনোকষ্ট, অদৃশ্য ভালোবাসা আমাকে আরো বেশি আবেগপ্রবন করে তুললো। আমি অন্যকে বিয়ে করলেও অনন্ত এই মেয়েটি হাসি মুখ দেখতে চাই। আমার অলক্ষ্যে যে আমাকে ভালোবেসেছে তার নিঃশ্বার্থ পবিত্র ভালোবাসাকে সম্মান দিতে আমি তাকে একবার কৃতজ্ঞতা জানাতে না পারলে সরাজীবনের জন্য কষ্ট থেকে যাবে এমন এক অবস্থা। কিন্তু ঘর থেকে চাপতো দিনদিন বাড়তে থাকে। বললাম এই মাত্র চাকুরী ধরেছি, পকেট খরচই চলেনা, বিয়ে করে খাবো কি?। ঘর থেকে সাফ জবাব কেউই ধনী হয়ে বিয়ে করেনি, বিয়ে করে ধনী হয়েছেন। আর ঘুরেঘুরে বয়সও কমন করিনি।
কোন পথ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আমি বলি ঠিক আছে আমি রাজি এবং আমাকে কিছুই দেখতে হবে না মা ও ভাইবোনরা যা ঠিক করবেন আমি তাতেই রাজি। তারপরও একদিন কনে দেখতে আমাকে নিয়ে তারা গেলেন অবশ্য আমি কনের দিকে ভালো ভাবে তাকাইনি, কথাও অতি সংক্ষিপ্ত করি। দুইদিন পরে দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেলো। ঘর থেকে বলা হলো কনের সাথে কোন কথা বলার প্রয়োজন থাকলে মোবাইল নম্বর এনে দেই। আমি বলি না। কেনাকাটায়ও আমি যাচ্ছি না বলে জানিয়ে দেই। আমার এই মনমরা অবস্থা দেখে সবাই একটু চিন্তিত। কনের পক্ষের নিকটও এই সংবাদ চলে যায়। তারাও নানা ভাবে কথা বলতে চায় কিন্তু আমি খুব একটা সময় দেই না। তবে আমার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সবারই দুশ্চিন্তা একটু কম। যাই করিনা কেন সকলের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু যে আমি করবো না এ ব্যাপারে তারা নিশ্চিত।
নির্দিষ্টদিনে যথারীতি মহা ধুমধামে শুভবিবাহ সম্পন্ন হয়। নবপরিনিতা স্ত্রী খাটে বসা। বাসর রাতে আমি ঘরে প্রবেশ করে তারদিকে পিছনদিয়ে খাটের এক পাশে বসলাম। সে নেমে এসে আমাকে সালাম করলো। আমি তাকে পাশে বসালাম। আমি তার দিকে না চেয়েই বললাম আমি এখন বিয়ে করতে চাইনি। এর মানে এই নয় যে, আপনার প্রতি আমার কোন অপছন্দ আছে।

আমিও চাইনি। জোর করে দিয়ে দিয়েছে।

আপনিও চাননি। জোর করে দিয়েছেন, কেন ?

খাতার পৃষ্টায় পৃষ্টায় স্যার শব্দটি লিখেছিলাম। তাই।

মানে।

মানে তো সোজা। সে বললো, তার ছোট মামা আমাদের বিয়ের যিনি উকিল বাবা এবং আমার মামার বন্ধু তিনি কয়েকদিন আগে তাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সে ও তার মা তখন রান্না ঘরে ছিল। তার ছোট ভাই কে (যাকে তারা ইবলিশ বলেই ডাকে) মামা একটি পৃষ্টা বা খাতা এনে দিতে বলেছিলেন কি যেনো লিখবেন। ইবলিশটি নাকি সব রুম রেখে তার রুমে গিয়ে তার একটি খাতা এনে মামার হাতে দেয়। মামা খাতা হাতে নিয়ে তার মাকে আপা, আপা বলে চিৎকার করে উদগ্রিব হয়ে ডাকা শুরু করলেন আর বলতে থাকেন, তোমার মেয়ের রোগ পেয়েছি। পুরোনা পাগলের ভাত নাই নতুন পাগল হয়েছে। তার মা মানে আমার শাশুড়ি হস্তদন্ত হয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসলেন। কী হয়েছে, কী হয়েছে করতে করতে।
ইদানিং শাম্মীর মনমরা ভাব, পড়ালেখায় মন নেই, কাজে ব্যবহারে পরিবর্তনের কারণ পাওয়া গেছে। এই দেখ খাতার মধ্যে পৃষ্টায় পৃষ্টায় শুধু স্যার লেখা। কোথাও হালকা, কোথাও ওভাররইটিং করে মোটা করে লেখা, কোথাও আর্ট এর মতো করে আঁকা। কোথাও বাংলায় কোথাও ইংরেজিতে। তার মা রেগে বলেন তাতে কি হয়েছে। তাতে কি হয়েছে মানে, ইউনিভার্সিটিতে কোন স্যারের প্রেমে পড়েছে তোমার গুনধর মেয়ে। কোন দিন শুনবে মেয়ে পগারপার। মা রেগে অগ্নিশর্মা, এতাই রাগন্বিত হয়েছিলেন যেন বিস্ফোরিত হবেন এমন অবস্থা। মুখদিয়ে কথাই বের হচ্ছিল না। এর মধ্যে তার আব্বা অফিস থেকে ফিরলেন। তিনিও তাদের সাথে কথায় যোগ দেন। সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় তার বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ, ঘর থেকে বের হতে হলে সাথে কাউকে অবশ্যই নিয়ে বের হতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দ্রুত বিয়ের ব্যবস্থা করা।

আমি তাকে বললাম, আচ্ছা; তাহলেতো আপনি বেশ চালাক ও সাহসী মেয়ে।

সে বলে, তার সাহস তেমন নেই, তবে একবার সাহস করেছিল। যার জন্য এই বিপদ।

আমি কারণ জানতে চাইলে সে বলে, এই যে ছেলে দেখা শুরু হলো। সেতো কোন ভাবেই বিয়ে করবে না। তার এ কথা আগুনে বাতাস দেয়ার মতো সবার দুঃশ্চিন্তা আরো বাড়িয়ে দেয়। তারা আরো ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ছেলে খুঁজতে থাকেন। একদিন মামা এসে জানান তার এক ডাক্তার বন্ধুর বোনের ছেলে শিক্ষকতা করেন। ছেলের চলন. বলন ও ব্যবহার অতি মার্জিত। তার মতো ছেলে পাওয়া কঠিন। কিন্তু মেয়ের সাথে বয়সের পার্থক্যটা একটু বেশি হয়ে যায়। মামা মোবাইলে ছেলের ছবি দেখালেন। তার মা রাগে গজরাতে গজরাতে বললেন, চলবে চলবে। শিক্ষকের সাথে প্রেম, দেখাচ্ছি মজা। তার সাথে কোন আলোচনাই নেই। তার কোন মতামত পর্যন্ত নেয়া হয়নি। একদিন তাকে বলা হলো ছেলের পক্ষ আসছে। আমরা গিয়েছিলাম এবং আজকে তার পরিনতি ঘটলো।

আমি তাকে অবশ্য বলেছিলাম, এসব কথা বলতে তার ভয় করছে না ? আমিতো তার উপর বিশ্বাস হারাতে পারি।

কিছুক্ষণ কথা বন্ধ।

সে হঠাৎ বলল উঠে -না। ভয় পাই না। পাল্টা প্রশ্ন আপনি কেন বিয়ে করতে চাননি।

তার চোখে মুখে কিছুটা উদ্বিগ্নতা দেখে আমি তাকে আস্বস্থ করে বললাম, দেখুন বিয়েতে আমার অমত এমন নয়, বা আপনার প্রতি কোন অশ্রদ্ধা বা অপ্রীতি নেই। বরং আমার সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা আপনার জন্য। কিন্তু আমি আসলে অন্য একটি বিষয়ে রহস্য উন্মোচন করতে চেয়ে ছিলাম।

সে অস্ফুট কন্ঠে ছোট করে জিজ্ঞেস করে রহস্যটা কি ?

আমি তাকে ফোনের কথা উল্লেখ করে বলেছিলাম, যে আমাকে আমার অজান্তে ভালোবেসেছে তাকে কষ্ট দিতে চাইনি। চেয়ে ছিলাম তাকে জানিয়েই আমি বিয়ে করবো। তার হাসি মুখ দেখে। একথা শুনে সে মুখে হাত দিয়ে ফিক করে হেসে উঠলো। আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। কিছুটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বিয়ের দিন মেয়েরা এতা কথা বলে নাকি, এতা স্বাভাবিক ?

সে মুখ তুলে বললো আমিই সেই। কথাটি ধীরে ক্ষীণ কন্ঠে বলেছিল, কিন্তু মনে হলো পুরো ঘরে প্রতিধ্বনি হচ্ছে। আমি বিষ্ময়ে বিমূঢ় বাকরুদ্ধ। আমি আবার তাকে বলললাম আপনি! আমি আর কথা বলতে পারছি না। সে ছোট করে বলে হ্যাঁ। এই সেই মোলায়েম, পেলব কচি কন্ঠি তটিনি! বিয়ের বিষয়ে প্রথম দিকে সে দৃঢ়ভাবেই বাঁধা দিয়েছিল। কিন্তু যেদিন আমরা তাকে দেখতে যাই তার পর থেকে সে সহযোগিতা করতে থাকে। যদিও বাড়ির লোকজনদের সামনে এখন ভাব করেছে যাতে সবাই বুঝেন সে খুব একটা খুশী নয়। আমার মুখে কোন কথা নেই।
আমার বিষ্ময় ভাঙ্গাতে সে বললো। তার এক দূর সম্পর্কের ফুফুর বাড়ি আমার কলেজের পাশে এবং এক ফুফাতো বোন আমার ছাত্রী। সেখানে বেড়াতে গিয়ে সে আমাকে দেখে। আমার প্রতি তার কোন আগ্রহ ছিল না বরং ফুফাতো বোনের সাথে আমাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টাই হতো বেশি।
যেদিন ফুফাতো বোন কথা প্রসঙ্গে জানায় বিয়ে হয়ে যাচ্ছে আমার সে দিন তার কি হয়েছে সে বুঝতে পারছিল না। একজন অপরিচিত, অদেখা মানুষকে, কি এক দুর্দান্ত সাহসে অপ্রকৃতিস্থের মতো ফোন দিয়ে বসে। ফোন বন্ধ দেখে তার আরো দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। বারবার ফোন দিতে থাকে। সকালে হঠাৎ করে ফোনে পেয়ে যায়। আমার জবাবের পর সে কিছুটা আস্বস্থ হয়। কিন্তু পুরোপুরি হতে পারে না। তার চলাফেরা, খাওয়া দাওয়া, পড়ালেখায় ব্যাপক পরিবর্তন চলে আসে। অন্যমনস্ক হয়ে যায়। কাজ করতে গিয়ে ভুল করে, পড়ালেখায় মন নেই। তার এই রোগের চিকিৎসা করাতেই চিকিৎসক মামাকে তাদের বাড়িতে ডেকে আনা হয়েছিল। মামা যে খাতায় স্যার লেখা দেখে পাগল হয়ে তার বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন সেই স্যারই হচ্ছি আমি। তার কথা শুনে আমার বিষ্ময়ের সীমা অতিক্রম করে গেছে। ভরামেঘে বিদ্যুৎ সঞ্চারের মতো আমার মাথা থেকে পায়ের নোখ পর্যন্ত শিহরিত হয়ে উঠে। যাকে দেখার জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করতে প্রস্তুত সেই কি না আমার সামনে আমার অর্ধঙ্গী হয়ে। আমি যেন চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়েছি। এক অশরীরি আত্মায় পরিনত হয়ে হাওয়ায় যেন ভাসছি । নিজেকে এতোই সুখী মনে হয়েছে যে পৃথিবীতে আমার থেকে সুখী মানুষ মনে হয় আর নেই । আমি এতক্ষণ তার দিকে এক বারো ভালোভাবে তাকাইনি। ফুল দিয়ে নানা কারুকার্যের নকশায় সাজানো ফুলসজ্জা আর তার গায়ে বিয়ের নানা অলংকারে তাকে ভালোভাবে দেখাই যাচ্ছিল না। আমি তার মুখটা একটু উপর করে ধরেছি সে তার বড়বড় চোখ দিয়ে আমার দিকে তাকালো। নদী যেমন মোহনায় এসে সাগরে মিশে তারপর হারিয়ে যায়। তার দুই চোখের তারায় আমি হারিয়ে গেলাম। কতক্ষণ এভাবে ছিলাম মনে নেই। সকালের আলো ফোটার পর বুঝতে পারলাম সকাল হয়ে গেছে। আমার ঘোর তখনও কাটেনি যতক্ষণ পর্যন্ত না সে কথা বলে উঠলো।

হঠাৎ পিছন থেকে চিৎকার সরগোলে ফিরে দেখি শাম্মী-মনিষাসহ বিমানের লোকজন আমাদের ডাকছেন। মাইকে ব্যাপক ডাকাডাকির পরও আমাদের কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে তারা খুঁজতে বেরিয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here